প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার মেয়ে মেরিন জামান রুহি উচ্চশিক্ষার স্বপ্নপূরণের পথে বড় একটি সাফল্য অর্জন করেছেন। আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের সন্তান হয়েও নিজের মেধা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন থেকে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা, অর্থাৎ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের স্কলারশিপ পেয়েছেন। এই বৃত্তির আওতায় আগামী চার বছর বিশ্ববিদ্যালয়টিতে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগ পাবেন তিনি।
রুহির বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের গনেশপুর গ্রামে। তাঁর বাবা আব্দুল কাদির পেশায় একজন চা বিক্রেতা। নৌকা দিয়ে চা বিক্রি করে সংসার চালান তিনি। সীমিত আয়ের এই পরিবারের জন্য সন্তানের উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহন করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট রুহির স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বরং প্রতিকূলতার মধ্যেই নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে গেছেন তিনি।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী ছিলেন রুহি। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তিনি জানতেন। উচ্চশিক্ষার জন্য বড় কোনো প্রতিষ্ঠানে পড়ার স্বপ্ন দেখলেও সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের বিষয়টি ছিল তাঁর জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ। তবে মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সেই বাধা অতিক্রম করার চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই প্রচেষ্টাই এনে দিয়েছে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য।
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন বাংলাদেশের একটি আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশোনার সুযোগ পান। এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ মেয়াদের জন্য বড় অঙ্কের স্কলারশিপ পাওয়া রুহির পরিবারের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি তাঁর নিজ এলাকার মানুষের কাছেও এটি গর্বের বিষয় হয়ে উঠেছে।
রুহির বাবা আব্দুল কাদির নৌকা নিয়ে চা বিক্রি করেন। নদীপথে মানুষের কাছে চা পৌঁছে দিয়ে উপার্জন করা তাঁর প্রতিদিনের জীবনের অংশ। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে দীর্ঘদিন ধরে তিনি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর সীমিত উপার্জনের মধ্যেই সন্তানদের পড়াশোনা ও পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে হয়। সেই পরিবারের সন্তান রুহির এত বড় শিক্ষাবৃত্তি অর্জন তাই স্থানীয় মানুষের কাছে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
রুহির সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গনেশপুর গ্রামসহ ছাতকের বিভিন্ন এলাকায় আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁর এই অর্জনে অভিনন্দন জানিয়েছেন। অনেকেই মনে করছেন, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের সন্তানদের জন্য রুহির সাফল্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে থাকবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী শুধু অর্থের অভাবে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারেন না। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য কম থাকলে ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পাওয়াকে অনেকেই অসম্ভব মনে করেন। রুহির অর্জন সেই ধারণাকে বদলে দেওয়ার মতো একটি উদাহরণ। মেধা, অধ্যবসায় ও সঠিক সুযোগ পেলে সীমিত সামর্থ্যের পরিবার থেকেও একজন শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যেতে পারেন—রুহির সাফল্য তারই প্রমাণ।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, রুহির এই অর্জনে তারা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। মেয়ের পড়াশোনার ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারের মধ্যে যে দুশ্চিন্তা ছিল, বড় অঙ্কের এই স্কলারশিপ সেই উদ্বেগ অনেকটাই দূর করেছে। চার বছর ধরে পড়াশোনার সুযোগ পাওয়ায় রুহি এখন নিজের স্বপ্নকে আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে নিতে পারবেন বলে আশা করছেন তারা।
রুহির স্বজনদের মতে, পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে কখনোই তিনি নিজের লক্ষ্য থেকে সরে যাননি। বরং প্রতিটি প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর এই মানসিক দৃঢ়তা এবং পড়াশোনার প্রতি নিষ্ঠাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে এমন একটি অর্জনের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
রুহির এই সাফল্য শুধু একটি স্কলারশিপ পাওয়ার ঘটনা নয়, বরং একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের দরজা খুলে দিয়েছে। যে পরিবারের বাবা নৌকা নিয়ে চা বিক্রি করে সংসার চালান, সেই পরিবারের সন্তান যখন প্রায় ৭৫ লাখ টাকার শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে দেশের একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান, তখন সেটি নিঃসন্দেহে একটি অনুপ্রেরণাদায়ক ঘটনা।
শিক্ষাজীবনে এমন সাফল্য অর্জনের পর রুহির সামনে এখন নতুন এক অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী চার বছর তিনি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করবেন। নতুন পরিবেশে নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গড়ার প্রস্তুতিও নেবেন তিনি। তাঁর পরিবার ও স্থানীয়রা আশা করছেন, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রুহি আরও বড় সাফল্য অর্জন করবেন এবং একদিন নিজের এলাকার মানুষের জন্যও ইতিবাচক কিছু করতে পারবেন।
ছাতকের স্থানীয় শিক্ষার্থী ও তরুণদের কাছেও রুহির অর্জন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উঠে এসে সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যেও বড় একটি শিক্ষাবৃত্তি অর্জন প্রমাণ করে, উচ্চশিক্ষার সুযোগ কেবল বিত্তবান পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। যোগ্যতা ও অধ্যবসায় থাকলে বিভিন্ন বৃত্তি ও সুযোগের মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারেন।
এলাকাবাসী মনে করছেন, রুহির এই সাফল্য ছাতকের আরও অনেক শিক্ষার্থীকে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে উৎসাহিত করবে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত, তাদের সন্তানরাও এখন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখার সাহস পাবে। একটি গ্রামের সাধারণ পরিবারের মেয়ের এই অর্জন তাই ব্যক্তিগত সাফল্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণার বার্তা হয়ে উঠেছে।
রুহির গল্পে যেমন রয়েছে মেধা ও পরিশ্রমের স্বীকৃতি, তেমনি রয়েছে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও স্বপ্ন ধরে রাখার দৃঢ়তা। বাবার নৌকায় চা বিক্রির সংগ্রাম আর মেয়ের উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা—দুই বাস্তবতার মধ্য থেকেই তৈরি হয়েছে এই সাফল্যের গল্প। প্রায় ৭৫ লাখ টাকার স্কলারশিপ সেই স্বপ্নকে আরও বড় পরিসরে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা রুহির ভবিষ্যৎ পথচলার জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রুহি শুধু নিজের পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবেন না, বরং ছাতকের আরও অনেক তরুণ-তরুণীর জন্য উচ্চশিক্ষা ও সাফল্যের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবেন। তাঁর এই অর্জন প্রমাণ করেছে, স্বপ্নের আকার নির্ধারণ করে পরিবারের আর্থিক অবস্থা নয়; বরং সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য একজন মানুষের চেষ্টা, সাহস ও অধ্যবসায়ই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


