প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভায় প্রথমবারের মতো রদবদলের মধ্য দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন সিলেটের হুমায়ুন কবির। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতিতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই নেতাকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ায় সিলেটের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন দায়িত্ব বণ্টনের ফলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি ব্যতিক্রমী চিত্রও সামনে এসেছে। মন্ত্রণালয়টিতে এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের অধীনে দুইজন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করবেন।
এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের সময় শামা ওবায়েদ ইসলামকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। নতুন করে মন্ত্রিসভায় রদবদলের পরও তিনি একই দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। অন্যদিকে হুমায়ুন কবির নতুন করে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ায় একই মন্ত্রণালয়ে দুই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের ঘটনা ঘটল। সরকারের দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুক্রবার বঙ্গভবনে নতুন ছয়জন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠিত হয়। নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাদের শপথ পড়ান। শপথ অনুষ্ঠান শেষে নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ওই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমেই হুমায়ুন কবিরকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
হুমায়ুন কবির এর আগে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে সরকারের পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে।
বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক কর্মকাণ্ডেও হুমায়ুন কবির দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ছিলেন। দলের হয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, কূটনৈতিক পর্যায়ের আলোচনা এবং বিদেশি রাষ্ট্র ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে তিনি ভূমিকা পালন করেছেন। ফলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গায় তাঁর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
হুমায়ুন কবিরের নতুন দায়িত্ব পাওয়ার খবর সিলেটেও বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে। সিলেটের রাজনীতিতে তাঁর পরিচিতি এবং জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সিলেট থেকে উঠে আসা একজন রাজনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত হওয়াকে অনেকে এই অঞ্চলের জন্যও মর্যাদার বিষয় হিসেবে দেখছেন।
নতুন দায়িত্বে হুমায়ুন কবিরকে একদিকে সরকারের পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বার্থ তুলে ধরার ক্ষেত্রেও সক্রিয় থাকতে হবে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এ অবস্থায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্ক, বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ এবং বিভিন্ন বহুপক্ষীয় ফোরামে দেশের অবস্থান তুলে ধরার মতো বিষয়গুলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজের অংশ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংকট ও পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এমন প্রেক্ষাপটে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুই প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করায় কাজের পরিধি ভাগ করে নেওয়া এবং বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষায়িতভাবে নজর দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। শামা ওবায়েদ ইসলাম এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর সঙ্গে হুমায়ুন কবির যুক্ত হওয়ায় মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সমন্বয় তৈরি হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হুমায়ুন কবিরের দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে কাজের ইতিহাস তাঁকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য উপযুক্ত করে তুলেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুই প্রতিমন্ত্রী থাকার বিষয়টি দেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পর্যায়েও তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করলেও একই মন্ত্রণালয়ে দুই প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে ব্যতিক্রমী। ফলে নতুন এই দায়িত্ব কাঠামো কীভাবে কাজ করে এবং দুই প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে দায়িত্ব ও কাজের সমন্বয় কীভাবে হয়, সেদিকেও নজর থাকবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের।
হুমায়ুন কবিরের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকারের যোগাযোগ আরও সক্রিয় হতে পারে বলে প্রত্যাশা করছেন তাঁর অনুসারীরা। বিশেষ করে বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সিলেটের মানুষের কাছেও তাঁর এই নতুন দায়িত্ব বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ে সিলেটের একজন পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দায়িত্ব পাওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর প্রতি প্রত্যাশাও বেড়েছে। বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতির পাশাপাশি প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেট অঞ্চলের মানুষের বিভিন্ন স্বার্থ ও প্রত্যাশা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি ভূমিকা রাখবেন—এমন আশা করছেন অনেকে।
তবে নতুন দায়িত্বের সঙ্গে চ্যালেঞ্জও কম নয়। পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক রাজনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। এসব ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি অভিজ্ঞ কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে নতুন প্রতিমন্ত্রীকে।
সব মিলিয়ে হুমায়ুন কবিরের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় সাম্প্রতিক রদবদলের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে শামা ওবায়েদ ইসলামকে দায়িত্বে বহাল রেখে হুমায়ুন কবিরকে যুক্ত করায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এখন দুই প্রতিমন্ত্রীর নতুন কাঠামো তৈরি হয়েছে। এই কাঠামো কতটা কার্যকর হয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী কী ধরনের ভূমিকা রাখেন, তা এখন দেখার বিষয়।


