হবিগঞ্জে সংরক্ষিত বনে গাছ চুরির অভিযোগে ৬২ জনের বিরুদ্ধে মামলা

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে গাছ কাটা, চুরি এবং বিক্রির অভিযোগে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ ৬২ জনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করেছে বন বিভাগ। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছ রক্ষায় প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের মধ্যে একসঙ্গে এতসংখ্যক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে গাছ কাটা ও তা অবৈধভাবে কেনাবেচার অভিযোগে চুনারুঘাট থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। সাতছড়ি বন্যপ্রাণী রেঞ্জের কর্মকর্তা মোবারক হোসেন বাদী হয়ে মঙ্গলবার মামলাটি করেন। ১৯২৭ সালের বন আইনের ২০০০ সালে সংশোধিত ২৬(১ক)-এর (খ) ও (ঘ) ধারায় করা মামলাটিতে ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটির নম্বর ৩৪।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১৫ মে পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে গাছ কাটা হয়েছে। পরে এসব গাছ চুরি করে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কেনাবেচা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। বন বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দেওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গাছ কাটা, চুরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে।

মামলায় চুনারুঘাট উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মারুফ মিয়াকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া মাধবপুর উপজেলার শাহজাহানপুর ইউনিয়নের বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম আবুল, চুনারুঘাট উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শফিক মিয়া মহলদার, উপজেলা শ্রমিকদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর খান, উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক করিম সরকার এবং মিরাশী ইউনিয়ন কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সোহাগের নামও মামলায় রয়েছে। অন্য আসামিদের বিরুদ্ধেও সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে গাছ কাটা ও অবৈধভাবে কেনাবেচার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।

তবে মামলা হওয়া মানেই অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অপরাধী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন—এমনটি নয়। অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। একই সঙ্গে মামলায় রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নাম আসায় বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে গাছ কাটা এবং বনের সম্পদ পাচারের ঘটনায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। সাতছড়ি বন্যপ্রাণী রেঞ্জ কর্মকর্তা মোবারক হোসেন এবং চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে বলেও তারা জানিয়েছেন।

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান শুধু একটি বনভূমি নয়, এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর একটি। পাহাড়ি এই বনাঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা, পাখি ও বন্যপ্রাণীর আবাস রয়েছে। বনাঞ্চলের গাছ নির্বিচারে কাটা হলে শুধু গাছের সংখ্যা কমে না, এর সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। ফলে সংরক্ষিত বন থেকে একটি গাছ কেটে নেওয়ার প্রভাব অনেক সময় দৃশ্যমান ক্ষতির চেয়েও বড় হয়ে ওঠে।

একই দিনে রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য থেকে গাছ কাটা ও বিক্রির অভিযোগেও পৃথক আরেকটি মামলা করেছে বন বিভাগ। বন কর্মকর্তা এইচ এম এরশাদ বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এতে আরও ৪২ জনকে আসামি করা হয়েছে। দুটি মামলায় মোট ৬২ জনের বিরুদ্ধে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছ কাটা, চুরি ও বিক্রির অভিযোগ আনা হয়েছে।

রেমা-কালেঙ্গা বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক বনাঞ্চল। এই অভয়ারণ্যেও বিপুলসংখ্যক বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতির অস্তিত্ব রয়েছে। বন উজাড় ও অবৈধ গাছ কাটার কারণে এ ধরনের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হলে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, বন রক্ষার ক্ষেত্রে শুধু গাছ কাটা বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়; অবৈধ কাঠের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত পুরো চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনাও জরুরি।

সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান জানিয়েছেন, গাছ চুরির বিরুদ্ধে বন বিভাগ জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অবৈধ কাঠ আহরণকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা ছোটখাটো অপরাধ হিসেবে দেখছে না বন বিভাগ।

তবে পরিবেশকর্মীদের পক্ষ থেকেও তদন্ত প্রক্রিয়ায় সতর্কতার আহ্বান জানানো হয়েছে। স্থানীয় ওয়াইল্ডলাইফ কর্মী বিশ্বজিৎ পাল সরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় এ ধরনের পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তদন্তের সময় কোনো নিরীহ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও নজর রাখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

সাতছড়ি ও রেমা-কালেঙ্গার বনাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। এসব এলাকায় অবৈধভাবে গাছ কাটা হলে তার প্রভাব স্থানীয় পরিবেশের পাশাপাশি বৃহত্তর প্রতিবেশ ব্যবস্থার ওপরও পড়ে। বনভূমি ধ্বংস হলে মাটির ক্ষয় বাড়তে পারে, বন্যপ্রাণীর আবাস সংকুচিত হতে পারে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তাই সংরক্ষিত বন রক্ষায় নিয়মিত নজরদারি ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয় পর্যায়ে বন রক্ষায় কার্যকর নজরদারি থাকলে অবৈধভাবে গাছ কাটা ও পাচারের ঘটনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। পাশাপাশি বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় জনবল, সরঞ্জাম ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ দুর্গম ও বিস্তৃত বনাঞ্চলে নিয়মিত নজরদারি চালানো অনেক সময় এককভাবে বন বিভাগের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।

এদিকে মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে তাদের অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটা পাওয়া যায় এবং মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কোন দিকে এগোয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বন বিভাগের এই দুটি মামলা সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষায় প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের একটি বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে কার্যকর ফল পেতে হলে শুধু মামলা করাই যথেষ্ট নয়; তদন্তকে নিরপেক্ষ ও তথ্যনির্ভর করতে হবে, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে হবে এবং বন ধ্বংসের সঙ্গে যুক্ত অবৈধ বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

হবিগঞ্জের সাতছড়ি ও রেমা-কালেঙ্গার বন শুধু স্থানীয় মানুষের প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, দেশের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বন রক্ষা করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণ করা। গাছ চুরি ও অবৈধ বন উজাড়ের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা, কঠোর নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এসব বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

চাচা-ভাতিজা হত্যা মামলায় ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রোহিঙ্গা সংকটে পরিবেশ, নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে চাপ : সেনাপ্রধান

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ভোট দিয়ে বিরোধী এমপিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা ফখরুলের

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থীর নাম সংসদেই জানাবেন সিইসি

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ট্রিপল হত্যা: ১৬৪ ধারায় বাবুলের জবানবন্দি

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

চাচা-ভাতিজা হত্যা মামলায় ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রোহিঙ্গা সংকটে পরিবেশ, নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে চাপ : সেনাপ্রধান

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ভোট দিয়ে বিরোধী এমপিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা ফখরুলের

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থীর নাম সংসদেই জানাবেন সিইসি

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ট্রিপল হত্যা: ১৬৪ ধারায় বাবুলের জবানবন্দি

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হাফিজউদ্দিন নাকি কায়সার কামাল, শপথ পড়াবেন কে

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে হবিগঞ্জ মেডিকেলে সংঘর্ষ, আহত ১৫

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রাকসুর তহবিলের ৬১ লাখ টাকার ভাউচার নেই

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ