প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
জামালপুর: জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় চাচা ও ভাতিজাকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রায় এক দশক পর সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেক আসামিকে ৫০ হাজার টাকা করে এবং যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে জামালপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন এই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন বলে রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামি হলেন শাখাওয়াত, সোহেল, আল-আমিন, সাদ্দাম, অন্তর, উজ্জ্বল ও ফয়জুর। অন্যদিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া সাতজন হলেন চাঁন মিয়া, জিয়ার, শাহ আলম, কাওছার, সুমন, রিফাত ও মোস্তফা। সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা সবাই জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার আদারভিটা ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের বাসিন্দা। নিহতদের পরিবারের সদস্য এবং মামলার বাদীপক্ষও একই এলাকার বাসিন্দা।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম জানান, পূর্ববিরোধের জেরে ২০১৬ সালের ১৬ মে রাতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। সেদিন রাতে গান-বাজনার কথা বলে শাখাওয়াত ও সোহেল চাচা মহর আলী এবং তাঁর ভাতিজা স্বপন মিয়াকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান। এরপর তাদের মাদারগঞ্জ উপজেলার জোড়খালী ইউনিয়নের কুকুরমারী এলাকার ভানু ফকিরের পাটক্ষেতের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরে ওই পাটক্ষেতেই মহর আলী ও স্বপন মিয়াকে কুপিয়ে ও জবাই করে হত্যা করা হয় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর মরদেহ দুটি ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে যায় হত্যাকারীরা। পরিবারের সদস্যরা তাদের খোঁজ করতে থাকলেও প্রথম দিকে কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ঘটনার তিন দিন পর পাটক্ষেত থেকে দুজনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
স্বজনদের কাছে প্রিয় দুই মানুষের এমন নির্মম মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় শোক ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়। একসঙ্গে চাচা ও ভাতিজার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। পরে হত্যার কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ঘটনার পর নিহত স্বপন মিয়ার বাবা জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে মাদারগঞ্জ মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। ২০১৬ সালের ১৯ মে দায়ের করা ওই মামলায় মোট ২২ জনকে আসামি করা হয়। মামলাটি তদন্তের পর পুলিশ ১৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল করে। দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার পর মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসে।
রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রমাণের জন্য বিভিন্ন সাক্ষ্য ও তথ্য উপস্থাপন করে। বিচার চলাকালে মোট ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা এবং মামলার অন্যান্য নথি পর্যালোচনা শেষে আদালত বৃহস্পতিবার ১৪ আসামির বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণা করেন।
রায় ঘোষণার দিন আদালত প্রাঙ্গণে নিহতদের স্বজনদের মধ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের অনুভূতি তৈরি হয়। প্রায় ১০ বছর ধরে চলা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার পর আদালতের রায় নিহত দুই ব্যক্তির পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত হয়ে আসে। দীর্ঘ সময় পর রায় হওয়ায় স্বজনদের মধ্যে একদিকে যেমন স্বস্তি এসেছে, অন্যদিকে প্রিয়জন হারানোর পুরোনো ক্ষতও নতুন করে সামনে এসেছে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের আগে স্থানীয় পর্যায়ে একটি বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরেই দুই ব্যক্তিকে পরিকল্পিতভাবে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। আদালতের দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় এই অভিযোগ, আসামিদের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হয়। শেষ পর্যন্ত আদালত ১৪ আসামির মধ্যে সাতজনকে সর্বোচ্চ শাস্তি এবং সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
আইনজীবীরা বলছেন, ফৌজদারি মামলায় মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতকে মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট আইনগত বিষয় গভীরভাবে বিবেচনা করতে হয়। এই মামলাতেও দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষ্য গ্রহণ ও অন্যান্য বিচারিক কার্যক্রমের পর রায় দেওয়া হয়েছে। তবে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ কোনো পক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন—এটি বাংলাদেশের বিচারিক ব্যবস্থায় একটি স্বাভাবিক আইনি সুযোগ।
একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার শুধু সাজা ঘোষণার মধ্যেই শেষ হয় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা, আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সংগ্রাম। বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজে একই এলাকার মানুষের মধ্যে বিরোধ থেকে সহিংসতা তৈরি হলে তার প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক সম্পর্কের ওপরও থাকে। মাদারগঞ্জের এই ঘটনাও সেই বাস্তবতার একটি উদাহরণ হয়ে আছে।
২০১৬ সালের মে মাসের সেই রাতের পর মহর আলী ও স্বপন মিয়ার পরিবারকে প্রায় এক দশক ধরে আদালতের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তদন্ত, অভিযোগপত্র, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং যুক্তিতর্কের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে অবশেষে বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণা করা হলো। এই দীর্ঘ সময়ে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পাশাপাশি নিহতদের স্বজনদেরও বারবার আদালতে আসতে হয়েছে এবং বিচার শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম জানিয়েছেন, ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের পর এবং আসামিদের উপস্থিতিতে আদালত রায় ঘোষণা করেছেন। মামলার বিচারিক কার্যক্রমে রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেছে বলেও তিনি জানান।
রায়কে কেন্দ্র করে মাদারগঞ্জের গজারিয়া গ্রামেও আলোচনা তৈরি হয়েছে। একই গ্রামের একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া এবং শেষ পর্যন্ত কঠোর সাজা স্থানীয় মানুষের মধ্যেও নানা প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে পূর্ববিরোধ থেকে যেন এমন প্রাণঘাতী সংঘাত আর না ঘটে, সে বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিগত বিরোধ বা স্থানীয় দ্বন্দ্ব যখন প্রতিশোধের মানসিকতায় রূপ নেয়, তখন তা দ্রুত সহিংসতায় পরিণত হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে স্থানীয়ভাবে বিরোধ মীমাংসার কার্যকর উদ্যোগ, সামাজিক নেতৃত্বের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত হস্তক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কোনো বিরোধকে কেন্দ্র করে হুমকি বা সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হলে তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়াও জরুরি।
মহর আলী ও স্বপন মিয়া হত্যার ঘটনায় আদালতের বৃহস্পতিবারের রায় এখন পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার দিকে এগোবে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী পরবর্তী বিচারিক ধাপ রয়েছে। একইভাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরাও প্রচলিত আইনে উচ্চ আদালতে প্রতিকার চাইতে পারবেন।
প্রায় ১০ বছর আগে সংঘটিত একটি জোড়া হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে মামলার বিচারিক পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হলো। তবে নিহত দুই ব্যক্তির পরিবার ও স্বজনদের কাছে এই রায় কেবল আইনি সিদ্ধান্ত নয়, বরং দীর্ঘ প্রতীক্ষার একটি পরিণতি। চাচা মহর আলী ও ভাতিজা স্বপন মিয়ার প্রাণ কেড়ে নেওয়া সেই রাতের ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের পরিবারের কাছে হারানোর বেদনা রয়ে গেছে। আদালতের রায় সেই বেদনা মুছে দিতে না পারলেও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় দীর্ঘ অপেক্ষার একটি আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছে।

