প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ভোটের মাধ্যমে দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তেমনি নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে কে শপথ পড়াবেন, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে সাংবিধানিক আলোচনা। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। একাধিক প্রার্থী থাকায় সংবিধানের বিধান অনুযায়ী সরাসরি ভোটের মাধ্যমেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে শপথ অনুষ্ঠান নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছিল। এ বিষয়ে পর্যালোচনা শেষে আইন মন্ত্রণালয় যে মতামত দিয়েছে, তাতে বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পিকারের দায়িত্ব পালনকারী ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালই নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে শপথ পড়ানোর সাংবিধানিকভাবে যথাযথ কর্তৃপক্ষ বলে মত দেওয়া হয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদের আওতায় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে সংবিধানের ৭৪(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকারের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ডেপুটি স্পিকার তাঁর দায়িত্ব পালন করছেন। এই ধারাবাহিকতায় স্পিকারের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে শপথ পড়ানোর দায়িত্বও ডেপুটি স্পিকারের ওপর বর্তাবে বলে আইন মন্ত্রণালয় মত দিয়েছে।
রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণের মতো সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষ্ঠানে কে শপথ পড়াবেন, তা নিয়ে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা না থাকে, সে কারণেই বিষয়টি নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত নেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পাঠানো নথি যাচাই-বাছাই শেষে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধান পর্যালোচনা করে মন্ত্রণালয় তাদের অবস্থান জানায়।
আজকের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল অবসরপ্রাপ্ত অলি আহমদ বীর বিক্রম। সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে রাজনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে একাধিক প্রার্থী থাকায় ভোট গ্রহণের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মোট ৩৪৯ জন সদস্য এ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার কথা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের ৫০ জন সংসদ সদস্যও রয়েছেন। চট্টগ্রাম-৪ আসনটি বর্তমানে শূন্য থাকায় মোট সদস্যসংখ্যা ৩৫০-এর পরিবর্তে ৩৪৯ জনে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সাধারণ জনগণের সরাসরি ভোটে হয় না। সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেন। ফলে সংসদে কোনো দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এবারের নির্বাচনেও সংসদে দলীয় শক্তির সমীকরণ ভোটের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর ফলাফল ঘোষণা করা হবে। এরপর নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে বঙ্গভবনে। চিফ হুইপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। সেখানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতিসহ রাষ্ট্র ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। পুরো অনুষ্ঠান আয়োজন ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
শপথ অনুষ্ঠানকে ঘিরে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন ব্যক্তির দায়িত্ব গ্রহণ রাষ্ট্রের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ফলে শপথের সময়, স্থান, উপস্থিত অতিথি এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়েরও যোগসূত্র রয়েছে। প্রায় ৩৫ বছর পর আবারও একাধিক প্রার্থীর অংশগ্রহণে সংসদ ভবনে ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর আগে সর্বশেষ সংসদীয় ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আব্দুর রহমান বিশ্বাসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন—তবে প্রদত্ত তথ্যে প্রার্থীর নাম হিসেবে বদরুল হায়দার চৌধুরীর উল্লেখ রয়েছে। সেই নির্বাচনে আব্দুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।
এরপর দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসে এবং বিভিন্ন সময়ে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এবারের নির্বাচন তাই শুধু নতুন রাষ্ট্রপতি বেছে নেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং দীর্ঘ বিরতির পর সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
রাষ্ট্রপতির শপথ কে পড়াবেন—এই প্রশ্নের উত্তরও মূলত সাংবিধানিক দায়িত্ব বণ্টনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করায় একই সময়ে স্পিকারের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সামনে এসেছে। আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন। আর সেই দায়িত্বের অংশ হিসেবেই নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে শপথ পড়ানোর সাংবিধানিক কর্তৃত্ব তাঁর ওপর বর্তায়।
ফলে বৃহস্পতিবার ভোটের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর শুক্রবার বঙ্গভবনে শপথ অনুষ্ঠানে কায়সার কামালকেই শপথ পড়াতে দেখা যেতে পারে। তবে নির্বাচনের ফলাফল এবং পরবর্তী আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই বিষয়টি চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও শপথ অনুষ্ঠান রাষ্ট্রীয় একটি সাংবিধানিক আয়োজন। তাই নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। দীর্ঘ বিরতির পর ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় হিসেবে যুক্ত হতে যাচ্ছে।


