প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ঢাকা: দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে থাকা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি দেশের পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সমস্যা হিসেবে না দেখে জাতীয় নিরাপত্তা, পরিবেশ, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বহুমাত্রিক সংকট হিসেবে বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) মিরপুর সেনানিবাসের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত তিন সপ্তাহব্যাপী ক্যাপস্টোন কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সেনাপ্রধান এসব কথা বলেন। দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের বিষয়টি সামনে আনেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, এই সংকটের প্রভাব এখন আর শুধু সীমান্তবর্তী আশ্রয়শিবির কিংবা কক্সবাজারের নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর সঙ্গে দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলার বিভিন্ন দিকও যুক্ত হয়ে পড়েছে।
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি নানা ধরনের চাপ তৈরি করছে। তাদের অবস্থানের কারণে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে মাদক পাচার, চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক মানুষের আশ্রয়, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিত করতে গিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সেনাপ্রধানের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে নিপীড়ন ও সহিংসতার মুখে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় গড়ে ওঠা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী বসতি এখন দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিলেও বছরের পর বছর এই বিপুল জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব বহন করা দেশের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার মানবিক দায়বদ্ধতার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের কারণে স্থানীয় পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বনভূমি ও পাহাড়ি এলাকার ব্যবহার, জ্বালানি হিসেবে কাঠের ওপর নির্ভরতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বাড়তি চাহিদা পরিবেশগত ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সেনাপ্রধানের বক্তব্যে সেই পরিবেশগত চাপের বিষয়টিই নতুন করে সামনে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও রোহিঙ্গা সংকটকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী পরিস্থিতিতে সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদক চোরাচালান, মানবপাচার, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তারসহ বিভিন্ন অপরাধের ঝুঁকি নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগ রয়েছে। তবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সবাইকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করছেন। তাই অপরাধের ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি শরণার্থীদের মানবিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সেনাপ্রধানের বক্তব্যে অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান, পানি, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে জাতীয় সম্পদ ও প্রশাসনিক সক্ষমতা ব্যবহার করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিভিন্ন দেশ মানবিক সহায়তা দিয়ে পাশে থাকলেও সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় অর্থায়ন ও সহায়তা অব্যাহত রাখা ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। ফলে এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রোহিঙ্গা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শরণার্থী শিবিরে খাদ্য ও অন্যান্য মৌলিক সহায়তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক দাতা ও সংস্থাগুলোর ওপর উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা রয়েছে। সহায়তার ঘাটতি দেখা দিলে এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে শিবিরের জীবনযাত্রায়। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও শরণার্থীদের মধ্যে সম্পদের ওপর প্রতিযোগিতা বা সামাজিক চাপও বাড়তে পারে।
রোহিঙ্গা সংকটের নিরাপত্তাগত দিক নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে কথা বলেছেন সেনাপ্রধান। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের ক্যাপস্টোন কোর্সের আরেক সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা থাকলে রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টি নাও হতে পারত বলে মন্তব্য করেছিলেন। একই সঙ্গে যুদ্ধ এড়ানোর জন্যও একটি দেশের পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন বলে তিনি তখন উল্লেখ করেন।
এবারের বক্তব্যে অবশ্য তিনি মূলত রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক, পরিবেশগত, আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক প্রভাবের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে সংকটটির সমাধান কেবল শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
ক্যাপস্টোন কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়। তিন সপ্তাহের এই কোর্সে বিভিন্ন পেশার জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা অংশ নেন। সামরিক কর্মকর্তা ছাড়াও শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি, কূটনীতিক, সাংবাদিক এবং করপোরেট খাতের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের একই প্ল্যাটফর্মে এনে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা ও পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে নেতৃত্বের সক্ষমতা বাড়ানোই ছিল কোর্সটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
সেনাপ্রধান অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী ফেলোদের হাতে সনদপত্র তুলে দেন। এ সময় জাতীয় নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও সমসাময়িক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পায়। ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের ক্যাপস্টোন কোর্স মূলত কৌশলগত সচেতনতা বাড়ানো, সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ, বিভিন্ন খাতের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়ন বিষয়ে সমন্বিত ধারণা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হয়।
এবারের কোর্সে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কিছু পার্থক্য পাওয়া গেছে। কিছু প্রতিবেদনে ৪৫ জন ফেলোর অংশগ্রহণের কথা বলা হয়েছে, যেখানে সংসদ সদস্য, জ্যেষ্ঠ সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, কূটনীতিক এবং করপোরেট প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির কথা উল্লেখ রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে মানবিকতা ও জাতীয় স্বার্থের একটি কঠিন সমীকরণ তৈরি করেছে। একদিকে নিপীড়নের শিকার একটি জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার মানবিক দায়িত্ব, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী আশ্রয়ের কারণে পরিবেশ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর বাড়তে থাকা চাপ—দুই বাস্তবতার মধ্যেই বাংলাদেশকে এগোতে হচ্ছে। ফলে সংকটের স্থায়ী সমাধান এখন শুধু বাংলাদেশের একক দায়িত্ব নয়; বরং মিয়ানমার, প্রতিবেশী দেশ, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগের সঙ্গে এটি গভীরভাবে যুক্ত।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রত্যাবাসন কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী—উভয়ের নিরাপত্তা ও জীবনমান নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা ধরে রাখার মতো বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পাবে। সেনাপ্রধানের বক্তব্য সেই বহুমাত্রিক বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বাস্তব সুযোগ তৈরি হওয়ার ওপর। তার আগে পর্যন্ত বাংলাদেশকে মানবিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজস্ব পরিবেশ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষার কঠিন ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। সেনাপ্রধানের বক্তব্যে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটকে জাতীয় পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তাই নতুন করে স্পষ্ট হয়েছে।


