প্রকাশ:১৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের রায়নগরে প্রবীণ দম্পতি আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগম এবং তাঁদের গৃহকর্মী তাহমিনা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহতদের সন্তানরা। একই সঙ্গে চলমান পুলিশি তদন্তে সন্তুষ্ট না হলে মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বা উচ্চতর কোনো তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তরের দাবি জানাবেন বলেও জানিয়েছেন তাঁরা।
হত্যাকাণ্ডের পাঁচ দিন পর সোমবার সকালে রায়নগরের মিতালি আবাসিক এলাকায় নিজেদের বাসায় সংবাদ সম্মেলন করে এসব দাবি জানান নিহত দম্পতির প্রবাসী সন্তানরা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নিহত আব্দুস সাত্তারের ছেলে আরিফ ইফতেখার। পরিবারের সদস্যরা এ সময় তাঁদের স্বজনদের হত্যার ঘটনায় নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্তের ওপর গুরুত্ব দেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরিফ ইফতেখার বলেন, তাঁদের পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য দ্রুত উদঘাটন করা। যারা প্রকৃত অপরাধী, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ পর্যায়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন এবং প্রভাবশালী হওয়ার কারণে কেউ যেন আইনের আওতা থেকে বেরিয়ে যেতে না পারেন, সেটিও নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
নিহতদের সন্তানরা বলেন, হত্যাকাণ্ডের তদন্তে তাঁরা স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা দেখতে চান। মামলার তদন্ত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত থেকে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। তদন্তের মাধ্যমে যে তথ্য-প্রমাণ সামনে আসবে, তার ভিত্তিতেই প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করা হোক—এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।
আরিফ ইফতেখার বলেন, পুলিশের তদন্ত সন্তোষজনক না হলে তাঁরা মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তরের আহ্বান জানাবেন। তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সত্য উদঘাটন এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা। তদন্ত নিয়ে কোনো ধরনের সন্দেহ বা প্রশ্ন তৈরি হলে সেটি দূর করার জন্য উচ্চতর তদন্তের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তাঁরা।
সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের পক্ষ থেকে নিহত তিনজনের ছবি কোনো অনলাইন পোর্টাল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে প্রকাশ না করার অনুরোধ জানানো হয়। পরিবারের সদস্যদের মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের প্রতি এ বিষয়ে সংবেদনশীল থাকার আহ্বান জানান তাঁরা।
নিহত দম্পতির সন্তানরা তাঁদের বাবা-মা ও গৃহকর্মীর আত্মার শান্তির জন্য সবার কাছে দোয়া চান। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মামলাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত এবং সুষ্ঠুভাবে তদন্ত শেষ করার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে নিহত আব্দুস সাত্তারের তিন মেয়ে তাহমিনা, সেলিনা ও তারানা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা বলেন, ভয়াবহ এই হত্যাকাণ্ডের পর পরিবার গভীর শোক ও মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবুও তাঁরা বিশ্বাস করেন, সত্যকে দীর্ঘদিন চাপা দিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সময়ের সঙ্গে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশিত হবে এবং প্রকৃত অপরাধীরা শনাক্ত হবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তাঁরা।
এর আগে গত ১২ আগস্ট সকালে সিলেট নগরের রায়নগর এলাকার মিতালি ১১১ নম্বর বাসা থেকে আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও তাঁদের গৃহকর্মী তাহমিনার গলা কাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। আব্দুস সাত্তারের বয়স ছিল ৯০ বছর, সুরাইয়া বেগমের ৭৬ বছর এবং তাহমিনার বয়স ১৫ বছর বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই সিলেটজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। একই বাসা থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের কারণ ও জড়িতদের পরিচয় নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। বিশেষ করে নিহত দম্পতি ছিলেন প্রবীণ এবং দীর্ঘদিন ধরে ওই বাসায় বসবাস করতেন। তাঁদের সন্তানদের অধিকাংশই দেশের বাইরে থাকায় তদন্তের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
আব্দুস সাত্তার ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সদস্য ছিলেন এবং স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের একটি ওয়ার্ড কমিটির উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। স্ত্রী সুরাইয়া বেগমকে নিয়ে তিনি রায়নগরের নিজ বাসাতেই বসবাস করতেন। তাঁদের চার সন্তানের মধ্যে দুইজন লন্ডনে এবং দুইজন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন।
হত্যাকাণ্ডের দিন বিকেল ৩টার দিকে রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনির বাসিন্দা বাবুল মিয়াকে আটক করে পুলিশ। তাঁর বয়স ৪০ বছর বলে জানানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছিল, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ছুরি উদ্ধার করা হয় বলে পুলিশ জানায়।
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে বাবুলের প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং সেই সম্পর্কের জেরেই তিনি তিনজনকে হত্যা করেছেন। তবে শুরু থেকেই পুলিশের এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে আসছে নিহত দম্পতির পরিবার। তাঁদের ধারণা, হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে এবং বিষয়টি আরও গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পর শুক্রবার রাতে নিহত দম্পতির প্রবাসী মেয়ে সেলিনা সুলতানা বাদী হয়ে সিলেট মহানগরের কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। মামলার এজাহারে জমি-সংক্রান্ত পূর্ববিরোধের জেরে ভাড়াটে লোক দিয়ে তাঁর বাবা-মা ও গৃহকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। ফলে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য এবং পরিবারের অভিযোগের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
এদিকে মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে রোববার বাবুল মিয়াকে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ তাঁর কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আরও তথ্য জানার চেষ্টা করছে। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল, উদ্ধার হওয়া আলামত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।
তদন্তে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পুলিশের প্রাথমিক দাবির সঙ্গে মামলার এজাহারে পরিবারের উত্থাপিত অভিযোগের সামঞ্জস্য যাচাই করা। হত্যাকাণ্ডের পেছনে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, জমি-সংক্রান্ত বিরোধ কিংবা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, তা প্রমাণ ও তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন নিহতদের সন্তানরা।
একসঙ্গে তিনজনের এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর পরিবার যেমন ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় রয়েছে, তেমনি স্থানীয় মানুষের মধ্যেও ঘটনার প্রকৃত কারণ জানার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নিহতদের স্বজনদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে একটি বিষয়—তাঁরা দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত চান।
পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্তে যদি প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হয় এবং নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার না হন, তাহলে তাঁরা তদন্ত প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রাখবেন। কিন্তু তদন্ত নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার মতো অগ্রগতি না হলে তাঁরা উচ্চতর তদন্তের দাবি জানাবেন।
রায়নগরের এই হত্যাকাণ্ডে এখন তদন্তের পরবর্তী ধাপের দিকে তাকিয়ে আছে নিহতদের পরিবার ও স্থানীয় মানুষ। রিমান্ডে থাকা আসামির জিজ্ঞাসাবাদ, উদ্ধার হওয়া আলামত, মামলার এজাহারে উত্থাপিত অভিযোগ এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তদন্তকারীরা শেষ পর্যন্ত কী তথ্য সামনে আনেন, তার ওপরই নির্ভর করছে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের পথ। নিহত পরিবারের প্রত্যাশা, তদন্ত হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ এবং কোনো প্রভাব ছাড়াই প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে।


