প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি এবং সরবরাহ সক্ষমতা বাড়াতে সরকারকে সময় দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, দেশের জ্বালানি সংকটের চ্যালেঞ্জ এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতি থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসতে অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো এবং নতুন উৎস তৈরির পাশাপাশি কিছুটা সময় প্রয়োজন।
শনিবার দুপুরে সিলেটের একটি হলরুমে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জেলা পর্যায়ে বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বিগত বছরের বাস্তবায়ন মূল্যায়ন বিষয়ক জেলা কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বাণিজ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, জ্বালানি পরিস্থিতির বর্তমান সংকটকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তবে সংকট মোকাবিলায় সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। জ্বালানি টার্মিনালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন কূপ খনন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে ধীরে ধীরে দেশের জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা বাড়বে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে আনুমানিক দুই বছর সময় প্রয়োজন হতে পারে বলেও তিনি জানান।
বর্তমান জ্বালানি সংকটের পেছনে চাহিদা ও সরবরাহের বড় ব্যবধান রয়েছে বলে উল্লেখ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দৈনিক জ্বালানির চাহিদা সরবরাহের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এর সঙ্গে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে জ্বালানির চাহিদা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ায় সংকট আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি অর্থনীতির বিভিন্ন খাতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। শিল্পকারখানা, পরিবহন, কৃষি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের কার্যক্রম অনেকাংশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট উৎপাদন ব্যাহত করার পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য বিনিয়োগ অপরিহার্য। নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা জরুরি। এ কারণে সরকার জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানির পথও খোলা রাখা হচ্ছে।
তিনি জানান, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মালয়েশিয়া থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির চেষ্টা করছে সরকার। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি সংগ্রহের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ ঘাটতি মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশের নিজস্ব জ্বালানি অবকাঠামো শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের এই পরিকল্পনার সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্পর্কও রয়েছে। পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে শিল্প উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা, নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ সহজ হবে। অন্যদিকে জ্বালানি ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি পণ্য ও সেবার দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বাণিজ্যমন্ত্রী একই সঙ্গে কৃষি খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দিয়েছেন। সিলেট অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মশালায় তিনি বলেন, কৃষিক্ষেত্রে সাফল্যের পরবর্তী লক্ষ্য হওয়া উচিত কৃষিকাজ থেকে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক রিটার্ন নিশ্চিত করা। শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, কৃষিপণ্যের বাজার, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে কৃষিকে আরও লাভজনক খাতে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে।
সিলেটের কৃষিকে ঘিরে সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এ অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, কৃষিজমি এবং বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদনের সুযোগকে কাজে লাগানো গেলে কৃষি অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। কৃষকদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত কর্মশালায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জেলা পর্যায়ের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি আগের বছরের বিভিন্ন কার্যক্রমের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কৃষি খাতের উন্নয়নের সঙ্গে জ্বালানি পরিস্থিতিরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সেচ, কৃষিযন্ত্র পরিচালনা, উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনে জ্বালানির প্রয়োজন হয়। ফলে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকলে কৃষির উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। এ কারণে জ্বালানি সংকট সমাধানের পাশাপাশি কৃষি খাতের উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করার প্রয়োজন রয়েছে।
কর্মশালা শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী সিলেট নগরের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে বন বিভাগের আয়োজিত বিভাগীয় বৃক্ষমেলার উদ্বোধন করেন। সেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বৃক্ষের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের জ্বালানি চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, পরিবহন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির প্রয়োজনও বাড়ছে। তাই শুধু জরুরি ভিত্তিতে আমদানি বাড়ানো নয়, দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন, আমদানি অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।
বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তার মতে, জ্বালানি টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানো এবং নতুন কূপ খননের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি সরবরাহের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। তবে এসব অবকাঠামো নির্মাণ ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সময় লাগে। ফলে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য স্থায়ী সমাধান তৈরির কাজ একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকট থেকে দ্রুত উত্তরণের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তব অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। তাই সরকারের পক্ষ থেকে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ, এলএনজি আমদানির প্রচেষ্টা এবং জ্বালানি অবকাঠামো সম্প্রসারণের যে পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। শিল্প ও কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন—সব ক্ষেত্রেই জ্বালানির সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। সেই বাস্তবতায় সংকট কাটিয়ে একটি স্থিতিশীল জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার কত দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন ও সরবরাহ সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তার ওপর দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতি অনেকটাই নির্ভর করবে।


