প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের রাজনগরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি ভোজ্যতেলবাহী ট্রাক ধামাইছড়া ব্রিজের রেলিং ভেঙে পানিতে পড়ে গেছে। ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় ট্রাকটির চালক রুম্মান সরকার (৫৩) ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ট্রাকের হেলপার গুরুতর আহত হয়েছেন।
বুধবার মৌলভীবাজার-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের রাজনগর উপজেলার ধামাইছড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর মহাসড়কসংলগ্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্ধারকাজে সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন।
পুলিশ ও স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে ভোজ্যতেল নিয়ে একটি ট্রাক সিলেটের দিকে যাচ্ছিল। ট্রাকটি ধামাইছড়া এলাকায় পৌঁছালে কোনো একপর্যায়ে চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। এরপর দ্রুতগতিতে চলন্ত ট্রাকটি ব্রিজের রেলিংয়ে ধাক্কা দিয়ে রেলিং ভেঙে পানিতে পড়ে যায়।
দুর্ঘটনার অভিঘাত ছিল এতটাই তীব্র যে ট্রাকটি ব্রিজের রেলিং ভেঙে নিচের পানিতে গিয়ে পড়ে। ট্রাকের ভেতরে থাকা চালক ও হেলপার দুজনই পানিতে আটকা পড়েন। স্থানীয়রা দুর্ঘটনাটি দেখতে পেয়ে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন।
পরে খবর দেওয়া হয় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে। রাজনগর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার আলী হোসেনের নেতৃত্বে একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয়দের সহযোগিতায় উদ্ধারকাজ শুরু করে। একপর্যায়ে ট্রাকের ভেতর থেকে চালক রুম্মান সরকারকে উদ্ধার করা হয়। তবে ততক্ষণে তার মৃত্যু হয়েছে।
দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন ট্রাকের হেলপার। তাকে স্থানীয়দের সহযোগিতায় দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়। তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
রাজনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনামুল হক চৌধুরী দুর্ঘটনায় একজন নিহত ও একজন আহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দুর্ঘটনাকবলিত ট্রাকে চালক ও হেলপারসহ মোট দুজন ছিলেন। চালক ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন এবং গুরুতর আহত হেলপারকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ওসি আরও জানান, দুর্ঘটনার পর ঘটনাটি নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ধামাইছড়া ব্রিজের ওপর দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করে। মৌলভীবাজার ও সিলেটের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই আঞ্চলিক মহাসড়কে বিভিন্ন ধরনের পণ্যবাহী ভারী যানবাহনের চলাচল রয়েছে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্রিজের রেলিং ভেঙে ট্রাক পানিতে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে মানুষের ভিড় জমে যায়। অনেকে দূর থেকে দুর্ঘটনাকবলিত ট্রাকটি দেখার চেষ্টা করেন। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে কাজ শুরু করে। পানিতে পড়ে যাওয়া ট্রাকটি উদ্ধারের বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সড়ক দুর্ঘটনা সাধারণত একটি পরিবারের জন্য মুহূর্তের মধ্যে অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনে। রুম্মান সরকারের ক্ষেত্রেও তেমনই একটি দুর্ঘটনা তার জীবন কেড়ে নিল। জীবিকার তাগিদে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে পণ্য নিয়ে সিলেটের পথে যাত্রা করেছিলেন তিনি। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ধামাইছড়ার ব্রিজে ঘটে গেল মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। স্বজনদের জন্য তার এই আকস্মিক মৃত্যু নিঃসন্দেহে গভীর শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মৌলভীবাজার-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যানসহ নানা ধরনের যানবাহন চলাচল করে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া চালকদের জন্য সড়কের নিরাপত্তা, ব্রিজের অবস্থা, দৃশ্যমানতা এবং যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভারী পণ্যবাহী যানবাহনের ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতা বা নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে ধামাইছড়া এলাকায় ঠিক কী কারণে ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। চালক ঘুমিয়ে পড়েছিলেন কি না, অতিরিক্ত গতি ছিল কি না, যান্ত্রিক কোনো ত্রুটি দেখা দিয়েছিল কি না কিংবা সড়কের অন্য কোনো পরিস্থিতি দুর্ঘটনার পেছনে ভূমিকা রেখেছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের কারিগরি অবস্থাও পরীক্ষা করা হতে পারে। একই সঙ্গে ব্রিজের রেলিংয়ের অবস্থা ও দুর্ঘটনার সময়কার পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এদিকে দুর্ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্রিজটির নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ব্রিজের রেলিং ভেঙে যাওয়ায় ভবিষ্যতে একই স্থানে আরও কোনো যানবাহন দুর্ঘটনার শিকার হলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত রেলিং মেরামত এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
একজন চালকের মৃত্যু এবং একজনের গুরুতর আহত হওয়ার মধ্য দিয়ে ধামাইছড়ার এই দুর্ঘটনা আবারও সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। মহাসড়কে চলাচলকারী ভারী যানবাহনের চালকদের সতর্কতা, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ও ব্রিজগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা জরুরি। একই সঙ্গে দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।


