প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এবার দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাব্য পথের সামনে দাঁড়িয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার কারণে তিনি বিএনপির মহাসচিব এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বলেও দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের বিষয়টি জানান বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষ থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রিজভীর ভাষ্য অনুযায়ী, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলের নাম চূড়ান্ত করা হয়। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি দলের মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। দীর্ঘদিন বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একজন নেতার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার সম্ভাবনা তাই রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
তবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার ক্ষেত্রে দলীয় মনোনয়নের পাশাপাশি সাংবিধানিক ও নির্বাচনী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার বিষয় রয়েছে। ফলে দলীয় প্রার্থী হিসেবে তার নাম ঘোষণার পর এখন পরবর্তী প্রক্রিয়ার দিকেই তাকিয়ে আছে রাজনৈতিক মহল।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের শুরু জাতীয় পর্যায়ের বড় কোনো পদ দিয়ে হয়নি। একজন শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে ধীরে ধীরে স্থানীয় সরকার, জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিসভা এবং দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে এসেছেন তিনি। তার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হলো ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। তিনি ঠাকুরগাঁও থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজও ছিলেন বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা, সাবেক মন্ত্রী এবং জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার।
শিক্ষাজীবনে মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। সেখানে ছাত্রজীবনেই রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা তৈরি হয়। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সংগঠনটির এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে অর্থনীতি বিষয়ে শিক্ষকতা করেন তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্বেও কাজ করেছেন।
১৯৭৯ সালে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। ১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর এস এ বারী পদত্যাগ করার আগ পর্যন্ত তার ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল। এরপর আবার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান। ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
১৯৮৬ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন মির্জা ফখরুল। শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নিয়ে তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮৮ সালের ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। স্থানীয় সরকারের এই দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
এরপর দেশের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। একই সময়ে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
জাতীয় সংসদেও তার রাজনৈতিক পথচলা ছিল নানা উত্থান-পতনে ভরা। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তিনি জয়ী হতে পারেননি। দুই নির্বাচনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।
অবশেষে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হন মির্জা ফখরুল। ওই নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী রমেশ চন্দ্র সেনকে পরাজিত করেন।
২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে মির্জা ফখরুল প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। পরে তাকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি সরকারের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আবার ঠাকুরগাঁও-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রমেশ চন্দ্র সেনের কাছে পরাজিত হন। পরে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ এবং বগুড়া-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান। বগুড়া-৬ আসনে জয়ী হলেও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় পরবর্তী সময়ে আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়।
এরই মধ্যে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় তার অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে থাকে। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপর বিএনপির বিরোধী দলীয় রাজনীতিতে তিনি দলের অন্যতম প্রধান মুখপাত্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
২০১১ সালের ২০ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা গেলে মির্জা ফখরুলকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে তিনি দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন।
এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মির্জা ফখরুল। দলীয় কর্মসূচি, আন্দোলন, নির্বাচন, রাজনৈতিক সংকট এবং সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনায় তিনি বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে সামনে ছিলেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক ভূমিকার কারণে দলের ভেতরেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছেন।
রাষ্ট্রপতি পদে তার নাম আসার মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথের একটি নতুন অধ্যায় সামনে এসেছে। রাষ্ট্রপতি পদটি দলীয় রাজনীতির সরাসরি নেতৃত্বের চেয়ে ভিন্ন ধরনের দায়িত্ব বহন করে। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের পরিধি এবং ভূমিকা সংবিধান দ্বারা নির্ধারিত। ফলে একজন সক্রিয় দলীয় রাজনীতিকের রাষ্ট্রপতি পদে যাওয়ার সম্ভাবনা রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
মির্জা ফখরুলের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গেও রাজনীতির দীর্ঘ পথচলা জড়িয়ে আছে। তিনি রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। তাদের দুই মেয়ে রয়েছে। তার পরিবারের সদস্যরাও নিজ নিজ পেশায় যুক্ত রয়েছেন।
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিত্ব থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছেছেন তিনি। পৌর চেয়ারম্যান হিসেবে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা, সংসদ সদস্য হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ, মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন এবং পরে দীর্ঘদিন বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব—সব মিলিয়ে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।
তার রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা তাই শুধু বিএনপির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বে পরিবর্তনের বিষয় নয়; দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ দীর্ঘদিনের দলীয় মহাসচিবের পদ থেকে সরে গিয়ে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
এখন মির্জা ফখরুলের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া। দলীয় প্রার্থী হিসেবে তার নাম ঘোষণার পর মনোনয়নসহ পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
একজন শিক্ষক থেকে রাজনীতিতে আসা, পৌর চেয়ারম্যান হওয়া, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া, প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন এবং দীর্ঘ সময় একটি বড় রাজনৈতিক দলের মহাসচিব হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়ার পর এবার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। তার এই যাত্রা সফলভাবে শেষ হয় কি না, সেটিই এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি।


