প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর অবশেষে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককে ৬ লেনে উন্নীত করার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের একটি বড় প্রতিবন্ধকতার সমাধান হয়েছে। হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার কল্যাণপুর এলাকায় জমি অধিগ্রহণ, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থানান্তর এবং স্থানীয়দের আপত্তিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা নির্মাণকাজ এখন পুনরায় শুরু হওয়ার পথে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন গতি আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোর। রাজধানী ঢাকা, সিলেট বিভাগ, চট্টগ্রাম বন্দরগামী পণ্যবাহী যানবাহন এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কোটি মানুষের যাতায়াতের প্রধান সড়ক এটি। বছরের পর বছর যানজট, দুর্ঘটনা এবং অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের কারণে মহাসড়কটি ৬ লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে কাজ এগিয়ে গেলেও বাহুবলের কল্যাণপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে জটিলতার কারণে নির্মাণকাজ থমকে ছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়কের সম্প্রসারণের জন্য কল্যাণপুর এলাকায় একটি মন্দির, দুটি মসজিদ, একটি কবরস্থান, একটি শ্মশান এবং একটি মাদ্রাসার জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হয়। তবে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের নকশা পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে জমি ছাড়তে অনীহা প্রকাশ করেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, যথাযথ পুনর্বাসন এবং বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে। ফলে ওই অংশে দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকে এবং পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব সৃষ্টি হয়।
জানা যায়, পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে শুরু করে পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও জেলা প্রশাসন, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা একাধিকবার বিরোধ নিরসনের চেষ্টা করে। কিন্তু বিভিন্ন পক্ষের মতপার্থক্যের কারণে কার্যকর সমাধান সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনার পরও যখন অগ্রগতি হচ্ছিল না, তখন বিষয়টি স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়।
পরিস্থিতি নিরসনে জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছ এমপি উদ্যোগ নেন। তিনি ধারাবাহিকভাবে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয়, সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। তাঁর উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনায় বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের মতামত তুলে ধরেন এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থ রক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে জি কে গউছ এমপি কল্যাণপুর এলাকায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে তিনি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তা, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে নিয়ে একটি মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উজ্জ্বল রায়, মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ গিয়াস উদ্দিন, সড়ক ও জনপথ বিভাগের হবিগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন, বাহুবল মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুহুল আমিন তালুকদার, রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজ স্বামী বেদমায়া নন্দজী, ইসকনের অধ্যক্ষ উদয় গৌর ব্রহ্মচারী, মসজিদ ও মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি মোতাহের হোসেনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।
সভায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বাসন এবং আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে আসে, উন্নয়ন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। আলোচনার একপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সমঝোতায় পৌঁছালে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার অবসান ঘটে।
এ সময় জি কে গউছ এমপি বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি জানান, যেসব ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মহাসড়ক নির্মাণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেগুলো যথাযথভাবে পুনর্বাসন করা হবে এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হবে। তিনি আরও বলেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ৬ লেন প্রকল্প শুধু জাতীয় উন্নয়নের জন্য নয়, হবিগঞ্জসহ পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
তবে তাঁর বক্তব্যে “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে” উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের যে মন্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে, সেটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে বিবেচ্য। এ বিষয়ে সরকারি অবস্থান বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পৃথক হতে পারে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনের ফলে এখন কল্যাণপুর অংশের নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু করা সম্ভব হবে। এতে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়বে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি মহাসড়কটি চালু হলে যানজট কমবে, সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং ঢাকা থেকে সিলেট পর্যন্ত যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারাও এই সমঝোতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় একদিকে যান চলাচলে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন দ্রুত কাজ শুরু হলে স্থানীয় অর্থনীতি যেমন সচল হবে, তেমনি সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও কমবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির এই উদ্যোগ ভবিষ্যতের অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের জন্যও একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে। একই সঙ্গে তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পুনর্বাসন এবং ন্যায্য ক্ষতিপূরণ যথাসময়ে নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কল্যাণপুর অংশের জটিলতা নিরসন হওয়ায় এখন ঢাকা-সিলেট ৬ লেন মহাসড়ক প্রকল্প নতুন গতিতে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, উন্নয়ন ও জনস্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে প্রকল্পটি দ্রুত সম্পন্ন হলে দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই মহাসড়কে যাতায়াত আরও নিরাপদ, দ্রুত এবং আধুনিক হবে।


