প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক অঙ্গনে এক উল্লেখযোগ্য ও বড় ধরনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। দেশের অন্যতম প্রভাবশালী ও শীর্ষস্থানীয় ইসলামী রাজনৈতিক দল খেলাফত মজলিস আনুষ্ঠানিকভাবে এগারো দলীয় নির্বাচনী ঐক্য বা জোট থেকে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছে। শনিবার (২৫ জুলাই) অনুষ্ঠিত দলটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার বিশেষ বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের উপস্থিতিতে এবং দীর্ঘ আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যার ফলে রাজনৈতিক ময়দানে নতুন করে নানা সমীকরণ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বৈঠকের সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে খেলাফত মজলিস এই এগারো দলীয় ঐক্যের ব্যানারে আয়োজিত যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ ও কার্যক্রম থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে দলটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ভবিষ্যতে যদি দেশ, জাতি, জনতা ও ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে এবং কল্যাণে কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তবে বিষয়টি তারা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে এবং বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়াস বা প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকালে রাজধানী ঢাকার কাকরাইলস্থ ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার তৃতীয় সাধারণ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ৯টায় শুরু হওয়া এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও রুদ্ধদ্বার অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন দলটির সম্মানিত আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জোটের ভবিষ্যৎ এবং দলীয় কৌশল নির্ধারণের এই অধিবেশনে দলটির শীর্ষ পর্যায়ের অসংখ্য নেতা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। পুরো অধিবেশন অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করেন দলের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের। এই সাধারণ অধিবেশনে দেশের সার্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয় এবং দীর্ঘ আলোচনার পর জোট ত্যাগের এই চূড়ান্ত ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করা হয়। বৈঠক শেষে দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক প্রকৌশলী আব্দুল হাফিজ খসরু স্বাক্ষরিত একটি অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গণমাধ্যম ও দেশবাসীর কাছে এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
জোট ত্যাগ করার সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করে ওই বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মূলত একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখেই এই এগারো দলীয় ঐক্য গঠিত হয়েছিল এবং এটি ছিল একটি নির্বাচনি সমঝোতা মাত্র। যেহেতু জাতীয় নির্বাচন ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়ে গেছে এবং নির্বাচনী অধ্যায় সমাপ্ত হয়েছে, তাই এই ঐক্যের আনুষ্ঠানিক কার্যকারিতা ও প্রাসঙ্গিকতা মূলত তখনই শেষ হয়ে গিয়েছিল। এর পরেও সৌজন্য ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার খাতিরে নির্বাচন শেষ হওয়ার পর কিছুদিন এগারো দলীয় জোটের কিছু কর্মসূচিতে খেলাফত মজলিসের পক্ষ থেকে অংশ নেওয়া হয়েছিল। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং দলীয় নীতি ও আদর্শ অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে এখন থেকে এই ঐক্যের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে এগারো দলের কোনো ব্যানারে বা তাদের যৌথ কোনো কার্যক্রমে খেলাফত মজলিসের কোনো নেতাকর্মী অংশ নেবে না বলে কড়া ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মূলত এই বিচ্ছেদের ঘটনাটি হঠাৎ করে একদিনে ঘটে যায়নি। এর আগে গত ১৩ জুলাই বন্দরনগরী চট্টগ্রামে এগারো দলীয় জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সমাবেশে অংশ নেওয়ার পর এবং পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে খেলাফত মজলিস আনুষ্ঠানিকভাবে জোটের নেতৃত্বকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিল যে, ভবিষ্যতে জোটের কোনো সভা, সমাবেশ, পোস্টার, ব্যানার বা প্রচারণায় যেন দলটির কিংবা তাদের শীর্ষস্থানীয় কোনো নেতার নাম বা লোগো ব্যবহার করা না হয়। মূলত সেই সময়ই জোটের সঙ্গে খেলাফত মজলিসের দূরত্বের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আজকের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার বৈঠকে সেই পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হলো। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক ময়দানে খেলাফত মজলিস তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা ও স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা বজায় রেখে পথ চলার জোরালো বার্তা দিল।
শনিবারের এই বিশেষ অধিবেশনে দেশের দূরদূরান্ত থেকে আসা খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্যবৃন্দ এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সম্মানিত সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে উপস্থিত থেকে যারা অধিবেশনকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রদান করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন দলের নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী, অধ্যাপক আবদুল্লাহ ফরিদ, অধ্যাপক সিরাজুল হক, মাওলানা সাইয়্যেদ ফেরদাউস বিন ইসহাক ও মুফতি আবদুল হামিদ। এছাড়াও যুগ্ম মহাসচিবদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসাইন, মুহাম্মদ মুনতাসির আলী, এ বি এম সিরাজুল মামুন, ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সল ও অধ্যাপক মো. আবদুল জলিল। সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান এবং মুফতি আবুল হাসান এমপিসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সরব উপস্থিতিতে এই অধিবেশনটি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক গুরুত্ব লাভ করেছে। জোট ত্যাগের এই সিদ্ধান্তের ফলে আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতিতে খেলাফত মজলিসের ভূমিকা ঠিক কী হবে এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তাদের নতুন কোনো সমীকরণ তৈরি হয় কি না, এখন সেদিকেই গভীর দৃষ্টি রয়েছে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।


