প্রকাশ:১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশের গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, সারসংকট, দুর্নীতি কিংবা ঋণ খেলাপির মতো সমস্যাগুলো একেবারে থাকবে না—এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। অতীতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বিএনপি সরকারের সম্ভাব্য কর্মকাণ্ড নিয়ে নিজ দলের বিরুদ্ধেই নানা সমালোচনামূলক মন্তব্য করেন।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব মন্তব্য করেন রুমিন ফারহানা। তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদে উত্তেজনা ও হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। বক্তব্যের একপর্যায়ে বর্তমান সংসদকে অসহিষ্ণু বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রুমিন ফারহানা বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট হবে না—এমনটা হতে পারে না। একইভাবে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সারসংকট দেখা দেবে না, দরিদ্র কৃষকদের সার নিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হবে না—এমন পরিস্থিতিও হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দলগুলোর অতীত কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে রুমিন ফারহানা আরও বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসবে অথচ দুর্নীতিতে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হবে না, সেটিও সম্ভব নয়। তাঁর বক্তব্যে বিএনপির অতীত শাসনামলের বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয় উঠে আসে।
তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানেই ঋণ খেলাপিতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাওয়া এবং বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের সৃষ্টি হওয়া। এ প্রসঙ্গে তিনি ছয় লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ খেলাপির কথা উল্লেখ করেন।
তবে সংসদ সদস্যের বক্তব্যে উল্লেখ করা ঋণ খেলাপির পরিমাণ ও সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানের উৎস বা সময়কাল সংসদে তাঁর বক্তব্যের সময় বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। ফলে ওই পরিসংখ্যানের প্রেক্ষাপট আলাদাভাবে যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
রুমিন ফারহানার বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বর্তমান সংসদের সদস্যদের ঋণ খেলাপির প্রসঙ্গ। তিনি দাবি করেন, বর্তমান সংসদের বেশিরভাগ সংসদ সদস্যই ঋণ খেলাপি হিসেবে পরিচিত।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে ঋণ খেলাপির তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার জন্য হাইকোর্টে রিট করা দেশের রাজনীতিতে পুরোনো একটি সংস্কৃতি। এ ধরনের ঘটনা অতীতেও অনেকবার দেখা গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তাঁর এই বক্তব্যকে ঘিরে সংসদে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বক্তব্যের সময় সংসদ সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং হট্টগোলের পরিস্থিতি তৈরি হয়। রুমিন ফারহানা তখন সংসদের পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, বর্তমান সংসদকে তাঁর কাছে অত্যন্ত অসহিষ্ণু মনে হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে যেন আবার আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার সংসদীয় পরিবেশে ফিরে যাওয়া হয়েছে।
রুমিন ফারহানা অতীতের সংসদীয় অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সমালোচনা করা হলে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরা হট্টগোল করতেন। এখন বিএনপির সংসদ সদস্যরাও একই ধরনের আচরণ করছেন, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও খারাপ আচরণ করছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তাঁর এমন বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, বিএনপির একজন সংসদ সদস্য হিসেবে নিজ দলের শাসনামল ও বর্তমান রাজনৈতিক আচরণ নিয়ে রুমিন ফারহানার সরাসরি সমালোচনা সংসদে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঋণ খেলাপি ও নির্বাচনী যোগ্যতার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রার্থীর ঋণ খেলাপির বিষয়টি আইন ও নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানের সঙ্গে যুক্ত। এ কারণে নির্বাচনের আগে অনেক প্রার্থীর ঋণসংক্রান্ত অবস্থান যাচাই করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঋণ খেলাপির তালিকায় থাকা ব্যক্তিরা আদালতের শরণাপন্ন হন—রুমিন ফারহানা তাঁর বক্তব্যে সেই প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন।
তবে বর্তমান সংসদের ‘বেশিরভাগ সদস্য’ ঋণ খেলাপি—রুমিন ফারহানার এই দাবির বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তালিকা, সংখ্যা বা সরকারি পরিসংখ্যান তিনি সংসদে উপস্থাপন করেছেন কি না, তা তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়নি। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে এবং এর বাস্তবতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও তথ্য প্রয়োজন।
গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারসংকট নিয়েও রুমিন ফারহানা বিএনপির সম্ভাব্য সরকার পরিচালনার সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে মূলত ক্ষমতায় যাওয়া কোনো দলের জন্যই দেশের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকট রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়—এমন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
দেশের অর্থনীতিতে খেলাপি ঋণ দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় আলোচনার বিষয়। ব্যাংক খাতে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা, ঋণ পুনঃতফসিল, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাব এবং ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক হয়েছে। ঋণ খেলাপির পরিমাণ বাড়লে ব্যাংকের তারল্য, বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে সংসদে এ নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য নতুন করে সাধারণ মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
রুমিন ফারহানা তাঁর বক্তব্যে শুধু অর্থনীতি বা দুর্নীতির বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকেননি। সংসদের পরিবেশ নিয়েও তিনি সরাসরি কথা বলেন। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী মত বা সমালোচনা সহ্য করার ক্ষেত্রে সংসদের বর্তমান পরিবেশ যথেষ্ট উদার নয়।
সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং সমালোচনা করা বিরোধী দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একই সঙ্গে সংসদের কার্যক্রম শান্তিপূর্ণ ও কার্যকর রাখা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল থাকা সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব। রুমিন ফারহানার বক্তব্যে এই দুই দিকই উঠে এসেছে।
তাঁর বক্তব্যের পর সংসদে যে উত্তেজনা তৈরি হয়, সেটিও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নিজ দলের সম্ভাব্য ব্যর্থতা বা অতীতের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে একজন সংসদ সদস্যের সরাসরি মন্তব্য রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে এনেছে।
রুমিন ফারহানার বক্তব্যের মূল সুর ছিল, শুধু সরকার পরিবর্তন হলেই দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সমস্যা শেষ হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, কৃষকদের জন্য সার, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কমানোর মতো বিষয়গুলো সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে তাঁর বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয়।
তবে তাঁর বক্তব্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক দাবি ও পরিসংখ্যান নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের ব্যাখ্যা এবং সরকারি তথ্য সামনে এলে বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হতে পারে। সংসদে দেওয়া বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও আগামী দিনে অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, বুধবার জাতীয় সংসদে রুমিন ফারহানার বক্তব্যে বিএনপির শাসনামল, বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক পরিবেশ, খেলাপি ঋণ এবং সংসদীয় সহনশীলতার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একসঙ্গে উঠে এসেছে। তাঁর মন্তব্য ঘিরে সংসদে তৈরি হওয়া উত্তেজনা দেখিয়ে দিয়েছে, দেশের রাজনৈতিক পরিসরে অর্থনীতি ও জবাবদিহির প্রশ্ন এখনো কতটা স্পর্শকাতর। একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।


