প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বর্ষা মৌসুমের শুরুতে সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল যখন অথৈ জলরাশিতে পরিণত হয়, তখন চারপাশ যেন এক বিশাল সাগরে রূপ নেয়। এই দিগন্তজোড়া পানির বুক চিরে চলাচলের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে নৌকা। হাওরের মানুষের কাছে নৌকা কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি তাদের জীবিকার সঙ্গী এবং জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুনামগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মাইজবাড়ি গ্রামটি এই নৌকার কারিগরদের এক নিপুণ আবাসভূমি। হাতুড়ির ঠকঠক শব্দ, কাঠের কড়া ঘ্রাণ আর দক্ষ কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় এখানে প্রতিটি কাঠের টুকরো রূপ নেয় জীবনের ভরসায়। জেলাজুড়ে ‘নৌকা তৈরির গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত মাইজবাড়ি এখন যেন এক জীবন্ত ঐতিহ্যের নাম।
প্রায় দেড়শ বছরেরও বেশি সময় ধরে মাইজবাড়ি গ্রামের মানুষ নৌকা তৈরির এই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানকার কারিগররা তাদের এই পেশাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন। গ্রামটির তিন হাজারেরও বেশি মানুষের প্রধান পেশা হলো নৌকা তৈরি। হাওরের জীবনের প্রয়োজন মেটাতে বর্ষা আসার আগেই গ্রামের প্রতিটি ঘরে শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। এখানে তৈরি বারকি, খিলুয়া এবং ডিঙি নৌকা কেবল সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতি বছর বর্ষার মৌসুমে গ্রামটি থেকে প্রায় ২০ থেকে ২২ কোটি টাকার নৌকা বিক্রি হয়, যা এই এলাকার অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখছে। নৌকার আকার ও ধরণভেদে এর দাম ১২ হাজার টাকা থেকে শুরু করে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
মাইজবাড়ি গ্রামের প্রবীণ কারিগর হাফিজ উদ্দিনের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে রয়েছে প্রায় ত্রিশ বছরের বেশি সময়। তীব্র গরম উপেক্ষা করেও তিনি তার কাজে অবিচল। তিনি জানান, বর্তমানে কাজের বেশ চাপ থাকলেও আগের তুলনায় অবস্থা ততটা ভালো নয়। কাঁচামালের উচ্চমূল্য ও লাভের স্বল্পতার কারণে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। একই কথা জানালেন জাহাঙ্গীর হোসেন, যিনি ভোর থেকে রাত পর্যন্ত হাতুড়ি আর বাটালি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তাদের মতে, বর্ষার মৌসুম আসার আগেই তারা নৌকা তৈরির সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেন, কারণ বর্ষা শেষ হলে হাওরপারের মানুষের যাতায়াতের প্রধান ভরসা এই নৌকাই। তাহিরপুর থেকে আসা আমজাদ আলীর মতো শত শত মানুষ এই গ্রামের নৌকার ওপর আস্থা রাখেন, কারণ তাদের কাছে মাইজবাড়ির নৌকার মান ও স্থায়িত্ব বরাবরই সেরা।
নৌকা শিল্পের কারিগররা যতই ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করুন না কেন, বাস্তবতার নিরিখে তারা এখন বেশ প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি। আগেকার সময়ে স্থানীয়ভাবে কাঠ পাওয়া যেত, কিন্তু এখন দেশের দূরদূরান্তের জেলা থেকে কাঠ সংগ্রহ করতে হয়। কাঠের দাম এবং শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ফলে প্রতিটি নৌকার উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। অথচ সেই অনুপাতে বাজারে নৌকার দাম বাড়ানো সম্ভব হয় না। পুঁজির অভাবে অনেক কারিগর এখন স্থানীয় মহাজনদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। ফলে নৌকা বিক্রির একটি বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। এই অসহায়ত্ব থেকে মুক্তি পেতে কারিগররা বারবার সহজ শর্তে সরকারি ঋণ ও আর্থিক সহায়তার দাবি জানিয়ে আসছেন।
সুলেমান মিয়া নামের একজন নৌকা ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, এখনকার কাজ আগের মতো সহজলভ্য নয়। কাঁচামাল পরিবহন ও উৎপাদনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই খরচ বেড়েছে কিন্তু লাভের পরিমাণ কমেছে। আবু বক্করের মতো ব্যবসায়ীরা মনে করেন, সরকার যদি আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিত, তবে এই কুটির শিল্পটি আরও সমৃদ্ধ হতো এবং হাজার হাজার শ্রমিকের পরিবার স্বাবলম্বী হতো। তাদের এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা কেবল কারিগরদের দায়িত্ব নয়, এটি হাওর অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিসিকের পক্ষ থেকেও এই শিল্পটির প্রসারে কিছু উদ্যোগের কথা শোনা যাচ্ছে।
সুনামগঞ্জ বিসিকের উপব্যবস্থাপক এম এন এম আসিফ জানান, মাইজবাড়ি গ্রামের নৌকা শিল্পকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের আওতায় এনে উন্নয়নে বিসিক জেলা কার্যালয় ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কারিগরদের ক্ষুদ্র ঋণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য বিসিক সর্বদা প্রস্তুত। তিনি জানিয়েছেন, কারিগররা যদি আধুনিক প্রযুক্তির সংমিশ্রণে নতুন কোনো আবেদন নিয়ে আসেন, তবে প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে তাদের সব ধরনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে মাইজবাড়ির কারিগররা আবার নতুন উদ্যমে তাদের এই ঐতিহ্যবাহী কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন।
হাওরপারের সাত থেকে নয় লাখ মানুষের চলাচল ও দৈনন্দিন প্রয়োজনে নৌকা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। স্কুল-কলেজে যাতায়াত, রোগী হাসপাতালে নেওয়া কিংবা বাজারে পণ্য আনা-নেওয়া—সবকিছুর মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই নৌকা। তাই মাইজবাড়ি গ্রামের অস্তিত্বের সঙ্গে হাওরের মানুষের জীবনের গভীর সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। এই ঐতিহ্যবাহী গ্রামটি যদি সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পায়, তবে নৌকা তৈরির এই শিল্প কেবল সুনামগঞ্জ নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের একটি গর্বিত অর্থনৈতিক মডেলে পরিণত হতে পারে। কারিগরদের হাতের নিপুণ কারুকাজ আর তাদের জীবন সংগ্রামের গল্পগুলোই মাইজবাড়িকে করে তুলেছে দেশের এক অনন্য জনপদ, যেখানে আজও কাঠের শব্দে জীবনের সুর বাজে।
ভবিষ্যতের আধুনিকায়নের সাথে তাল মিলিয়ে যদি এই শিল্পকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির আওতায় আনা যায়, তবেই মাইজবাড়ির কারিগরদের মুখে হাসি ফুটবে। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি যদি বেসরকারি উদ্যোগগুলো এগিয়ে আসে, তবে এই কুটির শিল্পটি তার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারবে। মাইজবাড়ির প্রতিটি নৌকা যেন হাওরের মানুষের প্রতিটি সংকটে ত্রাণকর্তা হয়ে দাঁড়ায়। দেড়শ বছরের ঐতিহ্যের এই ধারা যেন কোনোভাবেই হারিয়ে না যায়, সেজন্যই এখন প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। নৌকা তৈরির শব্দে আজও মাইজবাড়ির আকাশ প্রকম্পিত হোক, হাওরের জলরাশি তাদের এই শ্রমকে সার্থক করে তুলুক—এটাই আমাদের কাম্য।


