প্রকাশ:০১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশের স্বাস্থ্যখাতের আমূল পরিবর্তন এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য মানসম্মত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে ঢাকা কেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার বৃত্ত ভাঙার সময় এসেছে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত জাতীয় ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন সম্মেলনে বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়ন এবং ক্রিটিক্যাল কেয়ার বা সংকটাপন্ন রোগীদের সেবা প্রদানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা। প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. জুবাইদা রহমান সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় একটি সমন্বিত ও বিকেন্দ্রীভূত উদ্যোগের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।
ডা. জুবাইদা রহমান তার বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন একটি অপরিহার্য সেবা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো, উন্নত মানের ক্রিটিক্যাল কেয়ার বা আইসিইউ সুবিধা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বড় শহর বা রাজধানী কেন্দ্রিক। তিনি সকল জেলা পর্যায়ে ক্রিটিক্যাল চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য জোরালো আহ্বান জানান। তার মতে, একটি সংকটাপন্ন রোগীকে কেবল সময়মতো উন্নত চিকিৎসা দিতে না পারার কারণে প্রাণ হারাতে হয়, যা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, সারা দেশের প্রতিটি জেলায় দক্ষ জনবল, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। তিনি চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় আধুনিক প্রযুক্তির সাথে পরিচিত করার পাশাপাশি উন্নত প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন, যাতে তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে রোগীদের জীবন রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
চিকিৎসকদের দায়িত্বশীলতার বিষয়টিও এদিনের সম্মেলনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন অত্যন্ত স্পষ্ট ও কড়া ভাষায় চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে আরও বেশি আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকার স্বাস্থ্যখাতে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ করছে, নতুন নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করছে এবং অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কিনছে। কিন্তু চিকিৎসকরা যদি তাদের দায়িত্ব পালনে শতভাগ আন্তরিক না হন, তবে এই বিপুল বিনিয়োগের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাবে না। মন্ত্রী তার বক্তব্যে চিকিৎসকদের সেবাকে কেবল পেশা নয়, বরং একটি ব্রত হিসেবে বিবেচনা করার তাগিদ দেন। সম্প্রতি বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলা ও অপচিকিৎসার যে অভিযোগগুলো গণমাধ্যমে উঠে আসছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন কঠোর বার্তা জনমনে এক ধরণের আশার সঞ্চার করেছে। আদ-দ্বীন হাসপাতালে নবজাতক মৃত্যুর ঘটনার মতো বেদনাদায়ক ঘটনাগুলো যাতে আর না ঘটে, সেজন্য চিকিৎসকদের পেশাগত ও নৈতিক দায়বদ্ধতাকে সর্বাগ্রে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন সম্মেলনে তার বক্তব্যে বর্তমান সরকারের সদিচ্ছার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের প্রধান লক্ষ্য। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই সরকার বাজেটে রেকর্ড বরাদ্দ দিয়েছে। তিনি ঢাকা শহর কেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার যে মানসিকতা, তা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বলেন, একজন রিকশাচালক বা কৃষক যখন অসুস্থ হন, তখন তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ছুটতে হয়, যা আর্থিকভাবে অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। এই বৈষম্য দূর করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে সেখানকার রোগীরা নিজেরাই নিজেদের এলাকায় মানসম্মত সেবা পান।
দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বিভিন্ন নেতিবাচক ঘটনা জনমনে এক ধরণের আস্থার সংকট তৈরি করেছে। হাসপাতালের অবহেলা কিংবা চিকিৎসকদের ভুল চিকিৎসার অভিযোগ প্রায়ই সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন সম্মেলনটি কেবল একটি পেশাগত আলোচনা সভা ছিল না, বরং এটি ছিল দেশের চিকিৎসা খাতের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা দেওয়ার একটি মঞ্চ। ডা. জুবাইদা রহমানের বক্তব্যের মূল নির্যাস ছিল আধুনিকায়ন ও বিকেন্দ্রীকরণ। প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া ক্রিটিক্যাল চিকিৎসা সেবা কখনো পূর্ণতা পেতে পারে না। তিনি এমন এক স্বয়ংসম্পূর্ণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখিয়েছেন যেখানে ঢাকার ওপর নির্ভরতা থাকবে না। প্রতিটি জেলা হাসপাতাল একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
সম্মেলনের আলোচকরা একমত পোষণ করেছেন যে, চিকিৎসকের মেধা ও যন্ত্রের আধুনিকায়ন একসাথে চলতে হবে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও প্রশিক্ষণের অভাবে চিকিৎসকরা সেগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছেন না। আবার অনেক হাসপাতালে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিরই অভাব রয়েছে। এই দুইয়ের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমেই চিকিৎসা সেবার আমূল পরিবর্তন সম্ভব। বিশেষ করে ক্রিটিক্যাল কেয়ার বা আইসিইউর মতো সেবাগুলো দেওয়ার ক্ষেত্রে ভুল করার কোনো সুযোগ নেই। এখানে প্রতিটি সেকেন্ড জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান করে। তাই ডা. জুবাইদা রহমানের প্রস্তাব অনুযায়ী, জেলা পর্যায়ে ক্রিটিক্যাল কেয়ারের জন্য আলাদা বিভাগ খোলা এবং সেখানে বিশেষায়িত চিকিৎসকদের পোস্টিং দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
সরকারের দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারকদের ভাষ্যমতে, অবকাঠামো উন্নয়নই শেষ কথা নয়। অবকাঠামোর চেয়েও বড় বিষয় হলো সেবাদানকারীদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। চিকিৎসক এবং রোগীর সম্পর্কের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা ঘোচাতে হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, তা কেবল চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে নয়, বরং স্বাস্থ্য খাতের সাথে যুক্ত সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য একটি অ্যালার্ম। কোনো সরকারি বরাদ্দ বা আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা যাবে না, যদি না যারা সেবা দিচ্ছেন তাদের অন্তরে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে।
সামগ্রিকভাবে, জাতীয় ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন সম্মেলনে চিকিৎসক সমাজ ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এই সংলাপে একটি নতুন আশার আলো দেখা দিয়েছে। যদি সরকারি বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, জেলা পর্যায়ের চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হয় এবং চিকিৎসকরা তাদের পেশাগত নৈতিকতা যথাযথভাবে পালন করেন, তবেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। ডা. জুবাইদা রহমানের সেই দূরদর্শী আহ্বানের প্রতিফলন যদি বাস্তবে রূপ পায়, তবে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে উন্নত চিকিৎসা সেবা। এটাই এখন দেশবাসীর প্রত্যাশা। সম্মেলন শেষে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, ঢাকা কেন্দ্রিক চিকিৎসার চাপ কমিয়ে বিকেন্দ্রীকরণ এবং মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করাই হবে আগামী দিনের মূল লক্ষ্য। আধুনিক ও দায়িত্বশীল চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমেই দেশ থেকে এই দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট দূর হবে বলে মনে করছেন সকলে।


