প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মাদকদ্রব্যের করাল গ্রাস থেকে সিলেট মহানগরীকে মুক্ত করতে একের পর এক সফল অভিযান পরিচালনা করছে সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি)। এরই ধারাবাহিকতায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে সিলেট নগরীর কাষ্টঘর এলাকা থেকে মো. আলী রাজ ওরফে আলী রাজা নামে এক কুখ্যাত মাদক কারবারিকে আটক করা হয়েছে। মাদক ব্যবসা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সিলেটের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া এই মাদক কারবারির আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে নগরীর সচেতন মহলে স্বস্তির নিঃশ্বাস বইছে। সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে বন্দরবাজার এলাকার অভিজাত কাষ্টঘর এলাকা থেকে তাকে আটক করে পুলিশ।
আটককৃত মো. আলী রাজ ওরফে আলী রাজা সুনামগঞ্জ সদর থানার মঙ্গলকাটা গ্রামের মৃত মোকাব্বির আলী ও মোছা. আসমা বেগমের সন্তান। দীর্ঘ দিন ধরে সে এই এলাকায় ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল বলে স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়। পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, কাষ্টঘর এলাকার মায়া হোস্টেলের সামনে সে নিয়মিত মাদক বেচাকেনা করছিল। তার এই অপতৎপরতার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিল। অবশেষে সোমবার সন্ধ্যায় পুলিশের একটি বিশেষ দল অত্যন্ত কৌশলী অভিযানের মাধ্যমে তাকে হাতেনাতে আটক করে। অভিযানের সময় তল্লাশি চালিয়ে তার কাছ থেকে ৩০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়েছে। এই ইয়াবাগুলো সে খুচরা পর্যায়ে বিক্রির উদ্দেশ্যে নিজের হেফাজতে রেখেছিল বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে।
সিলেট মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেল বুধবার এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই আটকের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে। অভিযানের সময় পুলিশের উপস্থিতিতে আলী রাজা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও কঠোর প্রতিরোধের মুখে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের অংশ হিসেবে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসএমপির অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মো. মনজুরুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, গ্রেপ্তারকৃত আলী রাজার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা নং ৪৫/২৯/৬/২৬ অনুযায়ী তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
মাদক কারবারিদের ধরতে সিলেট পুলিশ যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তা জনমনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে বন্দরবাজার ও কাষ্টঘরের মতো জনাকীর্ণ এলাকায় যেখানে মানুষের অবাধ চলাচল রয়েছে, সেখানে মাদক কারবারিদের উপস্থিতি সাধারণ মানুষের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন মাদক বিক্রেতা কেবল একটি পরিবারের ধ্বংসই ডেকে আনে না, বরং পুরো এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, দীর্ঘদিন ধরে আলী রাজা এই এলাকায় মাদক সিন্ডিকেট গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল। বিশেষ করে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে সে তার ইয়াবা ব্যবসা প্রসারিত করছিল। পুলিশের এই সময়োচিত পদক্ষেপ স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলী রাজের নেটওয়ার্কটি আরও বড় হতে পারে। আটক হওয়ার পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে মাদক সরবরাহকারী চক্রের অন্যান্য সদস্যদের নাম জানার চেষ্টা চলছে। শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে যারা খুচরা মাদক বিক্রেতা হিসেবে কাজ করছে, তাদের তালিকা করে পুলিশের নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে। কোনো মাদক কারবারিই যেন পার না পায়, সেই লক্ষ্যে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের পরিধিও বিস্তৃত করা হয়েছে। আলী রাজার বিরুদ্ধে অতীতেও কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের রেকর্ড আছে কি না, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
মাদকের ভয়াবহতা বর্তমানে সিলেটের সামাজিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে। ইয়াবার মতো মারাত্মক নেশা তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আলী রাজার মতো মাদক বিক্রেতারা যখন ধরা পড়ে, তখন সমাজে কিছুটা হলেও অপরাধের মাত্রা হ্রাস পায়। তবে এটি একটি চলমান যুদ্ধ। পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে এলাকায় কোনো অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড বা মাদকের আনাগোনা দেখলে সাথে সাথে পুলিশকে অবহিত করার। নাগরিক সহযোগিতা ছাড়া মাদক নির্মূল করা কঠিন, তাই সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।
আলী রাজা এবং তার সহযোগীরা যেভাবে ইয়াবা কেনাবেচার সাথে জড়িয়ে পড়েছে, তা সিলেট নগরীর সুস্থধারার সামাজিক পরিবেশকে কলুষিত করছিল। পুলিশ জানিয়েছে, আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় তার সর্বোচ্চ শাস্তির জন্য প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী এই অপরাধে দোষী প্রমাণিত হলে তার দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড হতে পারে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সিলেট নগরীকে মাদকমুক্ত রাখতে এই ধরনের অভিযান চলমান থাকবে। কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না, সে যে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকুক না কেন।
সবশেষে, কাষ্টঘর থেকে ইয়াবা কারবারি আলী রাজাকে আটকের এই ঘটনাটি স্পষ্টভাবে বার্তা দিচ্ছে যে, সিলেটের অপরাধীদের জন্য কোনো নিরাপদ স্থান নেই। পুলিশ প্রশাসন তাদের দায়িত্ব পালনে সর্বদা তৎপর। নগরবাসীর প্রত্যাশা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই কঠোর অবস্থানের ফলে সিলেটে মাদকের প্রসার পুরোপুরি বন্ধ হবে। অপরাধ নির্মূলে পুলিশের এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টা যেন ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকে, তা দেখার অপেক্ষায় নগরবাসী। স্থানীয় প্রশাসনের এই কঠোর তৎপরতা যদি বলবৎ থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে সিলেট একটি মাদকমুক্ত নগরী হিসেবে গড়ে উঠবে—এটাই এখন সাধারণ মানুষের একান্ত কাম্য। আটককৃত আলী রাজার বিরুদ্ধে করা মামলাটি এখন আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারধীন রয়েছে এবং এর যথাযথ বিচার সম্পন্ন করাই এখন প্রশাসনের বড় চ্যালেঞ্জ। পুলিশের দায়িত্ববোধ ও জনগণের সচেতনতা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই মাদকমুক্ত সমাজ গঠন সম্ভব।

