প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
একটি মায়ের কাছে তার সন্তানের চেয়ে বড় কোনো অবলম্বন পৃথিবীতে নেই। সেই সন্তান যখন আইনের বেড়াজালে বন্দী এবং দীর্ঘ সময় ধরে কারান্তরালে থাকেন, তখন একজন মায়ের মনের অবস্থা কী হতে পারে, তা হয়তো ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। বর্তমানে চট্টগ্রামের এক পরিবারের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে এমনই এক চরম বিপর্যয়। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর মা গত কয়েকদিন ধরেই চরম মানসিক অস্থিরতায় ভুগছিলেন। অবশেষে সেই চরম দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ থেকেই তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বুধবার ১ জুলাই দুপুরের দিকে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালের কার্ডিয়াক বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। এই সংবাদটি কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোক নয়, বরং এটি অনেক মানুষের হৃদয়েই গভীর সমবেদনার জন্ম দিয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় তাকে হাসপাতালের কার্ডিয়াক বিভাগে ভর্তি করা হয়। ভর্তির সময় তার হৃদযন্ত্রের কার্যক্রমে বড় ধরনের জটিলতা লক্ষ্য করেন চিকিৎসকরা। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করার পর দ্রুত চিকিৎসাসেবা শুরু করা হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও তিনি এখনো পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত নন। তাকে বর্তমানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল সার্বক্ষণিক তার স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনরা হাসপাতালের করিডোরে দীর্ঘ সময় ধরে উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করছেন, যেন একটি ভালো খবর পাওয়া যায়।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামি হিসেবে গ্রেপ্তারের পর থেকেই তার মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। পরিবারের সদস্যদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ছেলের কারাবন্দি জীবন, তার অসুস্থতার খবর এবং বারবার জামিন শুনানিতে ব্যর্থতার খবর তাকে ভেতর থেকে তিলে তিলে ক্ষয় করে দিচ্ছিল। তিনি নিয়মিতই ছেলের খবর নেওয়ার জন্য ব্যাকুল থাকতেন। এর আগেও যখন তিনি ছেলের অসুস্থতার খবর শুনেছিলেন, তখন থেকেই তার হৃদরোগের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। কিন্তু সর্বশেষ জামিন শুনানিকে ঘিরে তিনি এক বুক আশা নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন হয়তো এবার আদালত তার সন্তানকে মুক্ত করবেন। কিন্তু জামিন না হওয়ার খবরে সেই আশার প্রদীপ নিভে যায় এবং তিনি মানসিকভাবে গভীর অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যান।
পুত্রের জামিন না হওয়া এবং দীর্ঘ অনুপস্থিতি একজন বয়স্ক মায়ের সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছিল। চিকিৎসকরাও একমত যে, দীর্ঘদিনের তীব্র মানসিক চাপ বা স্ট্রেস হার্টের সমস্যার বড় কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে বলে মনে করছেন স্বজনরা। পলাশ সেন, যিনি শ্রী শ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-অভ্যর্থনা বিষয়ক সম্পাদক, তিনি এই মর্মান্তিক পরিস্থিতির কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, পুত্রের জামিন বাতিল হওয়ার পর এই গভীর পুত্রবিরহ ও উৎকণ্ঠাই মাকে শেষ পর্যন্ত স্ট্রোকের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এটি একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক দৃশ্য, যেখানে একটি পরিবারের সকল সুখ কেড়ে নিয়েছে আইনের জটিলতা ও পরিস্থিতির নির্মম বাস্তবতা।
একজন মা যখন বৃদ্ধ বয়সে নিজের সন্তানকে নিজের কাছে দেখতে পান না, তখন প্রতিটি মুহূর্ত তার জন্য একটি দীর্ঘ বছরের মতো মনে হয়। ছেলের গ্রেপ্তারের পর থেকে তিনি নিজেকে গুটিয়ে ফেলেছিলেন। সামাজিক কর্মকাণ্ড বা উৎসবের আমেজ তার জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। তিনি যেন কেবল একটি খবর পাওয়ার জন্য বেঁচে ছিলেন। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি প্রথম যে প্রশ্নটি করতেন, তা হলো—আজ কি কোনো খবর আছে? সেই খবর না পাওয়া আর বারবার আইনি ব্যর্থতার সংবাদ শোনার যাতনা তার শরীরে ও মনে যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে, তার চূড়ান্ত পরিণতিই আজ হাসপাতালের এই শয্যা।
তার অসুস্থতার খবর শুনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গা থেকে ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা হাসপাতালে ভিড় করছেন। অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, আইনের শাসন তার নিজস্ব গতিতে চলে, কিন্তু মানবিক বিষয়টিও তো এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। ছেলের জন্য মায়ের এই আকুতি ও চোখের জল সমাজের প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে নাড়া দিচ্ছে। সবাই এখন প্রার্থনা করছেন যাতে তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং শেষ বয়সে অন্তত নিজের সন্তানকে পাশে পান। তার এই অসুস্থতা সমাজের সেইসব মানুষের প্রতিও এক ধরনের প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে, যারা কেবল আইনি লড়াইয়ের কথা বলেন কিন্তু মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়টি উপেক্ষা করে যান।
বর্তমানে হাসপাতালের কার্ডিয়াক বিভাগে তিনি যে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা যেকোনো পরিবারের জন্যই এক মহাদুর্ভোগ। ডাক্তাররা তাকে সম্পূর্ণ বিশ্রাম এবং মানসিক দুশ্চিন্তামুক্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সন্তান কারারুদ্ধ থাকলে একজন মা কি আসলেই দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে পারেন? তার প্রতিটি হৃদস্পন্দন এখন যেন কেবলই ছেলের মুক্তির জন্য ব্যাকুল। তার এই অসুস্থতা এখন মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনি লড়াইয়ের মানবিক মূল্য নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। মানুষ প্রশ্ন করছে, একটি রাষ্ট্রের আইনি প্রক্রিয়া কি একজন মায়ের জীবনের চেয়ে বেশি মূল্যবান হতে পারে?
পরিবারের সদস্যরা এখন কেবল ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছেন যেন তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন। তারা হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে থাকা এই মমতাময়ী মায়ের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। পরিস্থিতি যাই হোক, একজন মায়ের অসুস্থতা সবসময়ই বেদনাদায়ক। আমাদের সমাজের মানুষের উচিত এই সময়ে তার পাশে দাঁড়ানো এবং মানবিক সমর্থন বজায় রাখা। আশা করা হচ্ছে, উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি শীঘ্রই আশঙ্কামুক্ত হবেন এবং তার এই লড়াইয়ের অবসান ঘটবে। এই কঠিন সময়ে পরিবারের সকল সদস্য ধৈর্য ধরে চিকিৎসকদের নির্দেশনা অনুযায়ী তাকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। পুরো জাতি এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তার সুস্থতার সংবাদের অপেক্ষায়, যাতে অন্তত এই একটি দিক থেকে কিছুটা স্বস্তি ফিরে পায় শোকাহত পরিবারটি। এই দুঃসময়ে মানবিকতার জয় হোক এবং তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসুক—এটাই এখন সবার কাম্য।


