প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ধারায় নিজেদের সম্পৃক্ত করতে দেশের তরুণ প্রজন্মের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষিত কর্মপ্রত্যাশী তরুণ-তরুণীদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার গ্রহণ করেছে নানামুখী যুগোপযোগী উদ্যোগ। এরই ধারাবাহিকতায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন ‘দেশের ৬৪ জেলায় শিক্ষিত কর্মপ্রত্যাশী যুবদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় তিন মাসব্যাপী ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কোর্সের সপ্তম ব্যাচের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। বুধবার ১ জুলাই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই বিশাল প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক।
অনুষ্ঠানটি কেবল একটি প্রশিক্ষণ কোর্সের আনুষ্ঠানিকতাই ছিল না, বরং এটি ছিল দেশের হাজারো স্বপ্নবাজ তরুণের নতুন পথচলার সূচনা। দেশের ৬৪টি জেলায় একযোগে শুরু হওয়া এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী আয়োজনে সভাপতিত্ব করেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম। পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত প্রাণবন্তভাবে সঞ্চালনা করেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান। এ সময় জেলা পর্যায়ের উর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের প্রতিনিধিরা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনলাইনে প্রায় পাঁচ হাজার প্রশিক্ষণার্থী যুক্ত ছিলেন। প্রতিটি প্রশিক্ষণার্থীর চোখেমুখে ছিল আগামীর স্বপ্ন জয় করার দৃপ্ত প্রত্যয়, যা অনুষ্ঠানের পরিবেশকে করে তুলেছিল অনন্য।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এই প্রকল্পের আওতায় সপ্তম ব্যাচে প্রায় ৪৮০০ জন তরুণ-তরুণী কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন, ডিজিটাল মার্কেটিং ও গ্রাফিক ডিজাইনের মতো অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণের অনন্য সুযোগ পাচ্ছেন। এই উদ্যোগ তাদের নিজেদের আত্মকর্মসংস্থানের পথ যেমন প্রশস্ত করবে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতেও সহায়তা করবে। সরকারের এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বেকারত্ব হ্রাস এবং পরিবারভিত্তিক অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
সভাপতির বক্তব্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম বলেন, দেশের শিক্ষিত বেকার যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের মাধ্যমে টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। প্রশিক্ষণার্থীরা যদি তাদের অদম্য আগ্রহ, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পুরো প্রশিক্ষণটি সম্পন্ন করতে পারেন, তবে তারা নিজেদের দক্ষতাকে পুঁজি করে দেশীয় ও বৈশ্বিক কর্মবাজারে সফলভাবে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবেন। এই উদ্যোগ তাদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের পথ আরও সুগম করবে এবং তাদের আত্মবিশ্বাসকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে।
ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ আলম প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, বাংলাদেশের অসংখ্য ফ্রিল্যান্সার বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে সুনামের সঙ্গে কাজ করে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনছেন। তবে অনেক সময় তাদের সাফল্যের গল্পগুলো সবার সামনে সেভাবে প্রকাশ পায় না। আমি প্রশিক্ষণার্থীদের বিশেষভাবে আহ্বান জানাই, আপনারা নিজেদের অর্জন ও নিয়মিত কাজের অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করুন। আপনাদের সাফল্যের গল্পই হতে পারে নতুন প্রজন্মের জন্য বড় প্রেরণা। আপনাদের এই গল্পগুলো দেখে দেশের আরও বেশি তরুণ-তরুণী দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিংকে একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে বেছে নিতে উৎসাহিত হবে।
প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৩৭৩ কোটি ৭৭ লাখ ২৩ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩৬ হাজার শিক্ষিত যুব-যুবতীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এই বিশাল প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড দেশের আটটি বিভাগের ৬৪টি জেলাতেই এই প্রশিক্ষণ সফলতার সঙ্গে পরিচালনা করছে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসব্যাপী সপ্তম ব্যাচের প্রশিক্ষণে দেশের প্রতিটি জেলা থেকে ৭৫ জন করে মোট ৪ হাজার ৮০০ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশ নিচ্ছেন। ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী এবং ন্যূনতম এইচএসসি পাস করা শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরাই এই প্রশিক্ষণ লাভের সুযোগ পেয়েছেন।
প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক। জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা এবং প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমেই চূড়ান্তভাবে প্রশিক্ষণার্থীদের নির্বাচন করা হয়েছে। এবার ভর্তির জন্য লক্ষাধিক আবেদন জমা পড়েছিল, যার মধ্যে মেধাতালিকার ভিত্তিতে প্রায় ৭০ হাজার আবেদনকারীকে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ৪ হাজার ৮০০ জনকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়েছে।
প্রকল্পের সাফল্যতা ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। প্রকল্পের আওতায় এর আগে ছয়টি ব্যাচে মোট ১৯ হাজার ২০০ জন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ, অর্থাৎ ১১ হাজার ৩৫৩ জন বর্তমানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। এ পর্যন্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মোট আয় ১৯ লাখ ৯৯ হাজার ৪৯০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯ কোটি ৯০ লাখ ৩৫ হাজার ৮৮৭ টাকা। অন্যান্য আয়সহ তাদের মোট উপার্জনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৪৯ লাখ ৭৩ হাজার ২১৫ টাকায়। এই অর্জিত সাফল্য প্রমাণ করে যে, সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ পেলে আমাদের দেশের যুবসমাজ যেকোনো বাধা জয় করতে সক্ষম।
প্রশিক্ষণার্থীদের আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে এবং তাদের মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি জেলায় বিশেষ মেন্টরিং ক্লাসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে তিন মাসে মোট ৬০০ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবেন। প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তুগুলোকে অত্যন্ত আধুনিক ও যুগোপযোগী করে সাজানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কম্পিউটার অফিস অ্যাপ্লিকেশন, ফ্রিল্যান্সিংয়ের মূল ভিত্তি, বেসিক ইংরেজি, ডিজিটাল মার্কেটিং, সফট স্কিল, স্মার্টফোনের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন এবং ভিডিও এডিটিং। প্রশিক্ষণার্থীদের যাতায়াত ভাতা, খাবার এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ উপকরণ সরকার থেকেই সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের সনদপত্র প্রদান করা হবে, যা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে সহায়ক হবে। পুরো প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মান নিশ্চিত করতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর নিয়মিত মনিটরিং করবে। এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের তরুণদের জন্য আত্মনির্ভরশীল হওয়ার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।


