প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের আকাশ-বাতাসে এখন স্বস্তির সুবাতাস। দীর্ঘদিনের একটি দাবি, একটি গভীর উদ্বেগ এবং নির্বাচনী জনসভায় দেওয়া সবচেয়ে জোরালো প্রতিশ্রুতি অবশেষে বাস্তবে রূপ নিল। সংসদের ফ্লোরে কণ্ঠভোটে পাস হলো যুগান্তকারী এক আইন, যা ব্রিটিশ আমলের পুরনো ও অকার্যকর জুয়া আইনকে চিরতরে ইতিহাসের পাতায় পাঠিয়ে দিল। সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের অদম্য প্রচেষ্টায় মঙ্গলবার ৩০ জুন জাতীয় সংসদে এই বিলটি পাস হওয়ার মাধ্যমে দেশের আইন ব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা হলো। মূলত জুয়া এবং অনলাইন বেটিংয়ের মতো সামাজিক ব্যাধি থেকে তরুণ প্রজন্ম ও সমাজকে রক্ষা করতেই এই কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
নির্বাচনের আগে প্রতিটি নির্বাচনী জনসভা, প্রতিটি উঠান বৈঠক এবং প্রতিটি গণসংযোগে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ছিলেন আপসহীন। তিনি বারবার সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, তিনি নির্বাচিত হলে সর্বপ্রথম যে কাজটির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবেন তা হলো জুয়ার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তিনি বুঝেছিলেন, বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা অনলাইন জুয়ার নেশায় যেভাবে নিমজ্জিত হচ্ছে, তা দেশের আগামী দিনের জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত। শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি এই বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন এবং মন্ত্রিসভার বৈঠকে বারবার জুয়া নির্মূলের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন। অবশেষে তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ হওয়ায় কেবল সিলেটবাসী নয়, বরং সারা দেশের সাধারণ মানুষের মাঝে এক বিশাল স্বস্তির নিঃশ্বাস বইছে।
নতুন এই আইনটি অত্যন্ত আধুনিক এবং সময়োপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। বর্তমান বিশ্বের ক্রমবর্ধমান অনলাইন বেটিং ও ডিজিটাল জুয়ার করাল গ্রাস থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করাই ছিল এই আইনের মূল লক্ষ্য। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই কঠোর শাস্তির বিধানগুলো কার্যকর হলে জুয়াড়িদের মনে ভয়ের সঞ্চার হবে এবং সামাজিক অবক্ষয় অনেকটাই রোধ করা সম্ভব হবে। আইনের প্রতিটি ধারা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে অপরাধের ভয়াবহতার নিরিখে শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষ করে অনলাইন বেটিং বা দূরবর্তী জুয়ার বিষয়টি বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় এই চক্রগুলো বিদেশ থেকে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং সাধারণ মানুষের টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে পাচার করে দেয়। এই অপরাধের ক্ষেত্রে নতুন আইনে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে কঠোরতম। এ ধরনের অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য আইন অনুযায়ী ৫ বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে অনলাইন বা ডিজিটাল জুয়ার সাধারণ ধরণগুলোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ১ কোটি টাকা জরিমানার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে সাধারণ মানুষ অনলাইনের ক্ষতিকর প্রলোভন থেকে অনেকটাই নিরাপদ থাকবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
প্রচলিত বা সাধারণ জুয়ার ক্ষেত্রেও আইনটি সমানভাবে কঠোর। আগে প্রচলিত আইনগুলো দুর্বল হওয়ায় অনেক সময় অপরাধীরা সহজেই জামিন পেয়ে যেত বা নামমাত্র শাস্তিতে পার পেয়ে যেত। নতুন আইনে প্রচলিত জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া বর্তমান সময়ের ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিংয়ের বিরুদ্ধেও নতুন আইনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেকোনো ধরনের ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিংয়ের অপরাধে জড়িতদের জন্য সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত বড় অংকের জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে, যা এই ধরনের অশুভ কর্মকাণ্ডকে অঙ্কুরেই বিনাশ করতে সাহায্য করবে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের এই সাফল্য কেবল একটি আইন পাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি তার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি যে জনগণের পালস বুঝতে পেরেছিলেন এবং তা বাস্তবায়নে কতটা দৃঢ় ছিলেন, এই বিলটি তারই প্রমাণ। সিলেট-১ আসনের সাধারণ ভোটার থেকে শুরু করে দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছেন, এই আইনটি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা গেলে দেশের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অনেকাংশেই কমে আসবে। বিশেষ করে তরুণদের মাঝে যে জুয়ার নেশা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা নিয়ন্ত্রণে এই আইন একটি শক্ত বর্ম হিসেবে কাজ করবে।
সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষের মতে, ব্রিটিশ আমলের অকার্যকর আইন দিয়ে বর্তমানের আধুনিক ও ডিজিটাল জুয়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না। নতুন আইনটি শুধু শাস্তির বিধানই তৈরি করেনি, বরং অপরাধীদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, দেশের মাটি ও মানুষের ক্ষতি করে কেউ পার পাবে না। আইনটি পাসের পর শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির তার প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, এটি তার একার বিজয় নয়, এটি বাংলাদেশের জনগণের বিজয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে।
মূলত, জুয়া একটি সামাজিক মরণব্যাধি। এটি শুধু ব্যক্তিকেই ধ্বংস করে না, বরং পুরো পরিবারকে পথে বসিয়ে দেয়। অনেক পরিবার তাদের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে এই জুয়ার নেশার কারণে। অপরাধ বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন যে, জুয়া বা বেটিংয়ের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা অপরাধ জগতের দিকে খুব দ্রুত ধাবিত হয়। তাই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া ছিল সময়ের দাবি। এখন নতুন এই আইন পাসের মাধ্যমে একদিকে যেমন অপরাধীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া হলো, তেমনি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রদানের প্রতিশ্রুতিও পূরণ হলো।
পরিশেষে বলা যায়, সংসদীয় গণতন্ত্রে জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা তাদের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সেই দায়িত্ব পালনে যে দূরদর্শিতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক নেতাদের জন্য একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। জুয়া ও বেটিংয়ের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ কেবল শুরু, আইনটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ গঠনই এখন দেশবাসীর মূল লক্ষ্য। সিলেটবাসীর আস্থার প্রতিদান দিয়ে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত রাখার যে অঙ্গীকার মুক্তাদির করেছিলেন, জুয়া নির্মূলের এই আইন পাসের মধ্য দিয়ে তার প্রথম ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি সফলভাবে সম্পন্ন হলো। এখন পুরো জাতি তাকিয়ে আছে আইনের এই কঠোর প্রয়োগ ও তার সুফল দেখার অপেক্ষায়।


