প্রকাশ: ১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত এবং সরকারি সম্পদের ক্ষতি রোধে পরিচালিত বিশেষ টাস্কফোর্স অভিযানে ১৬টি ড্রেজার মেশিন ও বালুবাহী নৌকা ধ্বংস করা হয়েছে। একই সঙ্গে বালু পরিবহনে ব্যবহৃত ১৫টি পাইপ বিকল করে দেওয়া হয়েছে এবং অবৈধ কার্যক্রমে জড়িত দুই ব্যক্তিকে জরিমানা করা হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার বিভিন্ন নদী ও জলাশয় এলাকায় একটি চক্র অবৈধভাবে ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে বালু উত্তোলন করে আসছিল। এতে নদীর তীর ভাঙন, কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, পানির স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন এবং স্থানীয় পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এসব অনিয়ম বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
প্রশাসনের সূত্র অনুযায়ী, মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গোয়াইনঘাট উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এ বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। উপজেলার লাঠি গ্রাম, নতুনবাজার, হাজিপুর ও লোনী এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ ও ধ্বংস করা হয়।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন গোয়াইনঘাটের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকারিয়া হোসেন। অভিযানের সময় প্রশাসনের কর্মকর্তারা সরেজমিনে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের চিত্র পর্যবেক্ষণ করেন এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
অভিযান চলাকালে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ১৬টি ড্রেজার মেশিন ও বালুবাহী নৌকা ঘটনাস্থলেই ধ্বংস করা হয়। পাশাপাশি বালু পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত ১৫টি প্লাস্টিক ও লোহার পাইপ ভেঙে দেওয়া হয়, যাতে এগুলো পুনরায় অবৈধ কাজে ব্যবহার করা না যায়।
এ সময় বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন লঙ্ঘনের দায়ে দুই ব্যক্তিকে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের মোট ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। প্রশাসন জানিয়েছে, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে।
অভিযানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশের সদস্য এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর একটি চৌকস দল সহযোগিতা করে। প্রশাসন, পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সমন্বিত অংশগ্রহণে অভিযানটি পরিচালিত হওয়ায় কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ছাড়াই কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। নদীর পাড়ের মাটি সরে যাওয়া, বসতভিটা ও কৃষিজমি ঝুঁকির মুখে পড়া এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। অনেকেই প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলন করলে শুধু পরিবেশের ক্ষতিই হয় না, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে জনজীবনেও। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, তীরবর্তী এলাকার ভাঙন বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হতে পারে। তাই বৈধ নিয়ম ও সরকারি অনুমোদন ছাড়া কোনো ধরনের বালু উত্তোলন বন্ধ করা জরুরি।
অভিযান শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জাকারিয়া হোসেন বলেন, পরিবেশ রক্ষা এবং সরকারি সম্পদ সংরক্ষণে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। এ ধরনের অপরাধ বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, শুধু অভিযান পরিচালনা করাই নয়, স্থানীয়দের সচেতন করাও প্রশাসনের অন্যতম লক্ষ্য। নদী, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারি বিধি-নিষেধ অমান্য করে কেউ যাতে অবৈধ কর্মকাণ্ড চালাতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনের নজরদারি আরও বাড়ানো হবে।
গোয়াইনঘাটের এই অভিযানকে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এককালীন অভিযানের পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি ও কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নদী ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখা হবে।


