প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দ্রুত চালু এবং মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল ক্লাস নিশ্চিত করার দাবিতে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে মেডিকেল কলেজসংলগ্ন মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে তারা আন্দোলন শুরু করেন। শিক্ষার্থীদের এই কর্মসূচির কারণে মহাসড়কের উভয় পাশে প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, অ্যাম্বুলেন্সসহ শত শত যানবাহন আটকা পড়ে এবং সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জানান, সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চালুর দাবিতে তারা টানা দশম দিনের মতো আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও হাসপাতাল চালুর বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান না হওয়ায় তারা কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ঘটনাস্থলে এসে হাসপাতাল চালুর একটি সুস্পষ্ট ও লিখিত রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লিনিক্যাল ক্লাস পরিচালনার নিশ্চয়তা দিতে হবে। এসব দাবির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আন্দোলনের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা মহাসড়কে বাঁশ ফেলে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকা পড়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন। বিশেষ করে দূরপাল্লার যাত্রী, কর্মজীবী মানুষ, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের ভোগান্তি ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকেই বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও সব ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়নি।
খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আন্দোলনকারীদের সড়ক ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। তবে শিক্ষার্থীরা তাদের দাবির বিষয়ে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি না পাওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অবস্থানে অনড় থাকেন। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট ১০ তলা আধুনিক হাসপাতাল ভবনের নির্মাণকাজ বহু আগেই শেষ হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে হাসপাতালটি এখনো চালু করা হয়নি। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবনের বিভিন্ন অংশ অযত্নে পড়ে রয়েছে বলে তারা দাবি করেন। তাদের মতে, এত বড় একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান চালু না থাকায় শুধু সরকারি সম্পদের অপচয়ই হচ্ছে না, সুনামগঞ্জ জেলার লাখো মানুষও আধুনিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, একটি মেডিকেল কলেজে তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতাল চালু না থাকায় তারা প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক শিক্ষা ও রোগী ব্যবস্থাপনার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন না। এর ফলে ভবিষ্যৎ চিকিৎসক হিসেবে তাদের দক্ষতা অর্জনের প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। তারা মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে এ সংকট চলতে থাকলে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, হাসপাতাল চালুর বিষয়ে অতীতেও একাধিকবার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৪ জুন হাসপাতাল চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। পরে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসেও একই ধরনের আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়িত হয়নি। এখন ২০২৬ সালেও বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে হাসপাতাল চালুর সময় আরও পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা। এ ধরনের বারবার আশ্বাসে তারা আস্থা হারিয়েছেন বলেও জানান।
স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শুধু শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের জন্য নয়, একটি জেলার সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাসপাতাল চালু থাকলে বিশেষায়িত চিকিৎসা, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা এবং উন্নত চিকিৎসা সুবিধা স্থানীয় জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়। একই সঙ্গে মেডিকেল শিক্ষার্থীরাও বাস্তব পরিবেশে প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ পান, যা একজন দক্ষ চিকিৎসক গড়ে তুলতে অপরিহার্য।
স্থানীয় বাসিন্দারাও মনে করেন, সুনামগঞ্জের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলায় আধুনিক হাসপাতাল চালু হওয়া সময়ের দাবি। বর্তমানে জটিল রোগে আক্রান্ত অনেক রোগীকেই চিকিৎসার জন্য সিলেট কিংবা রাজধানী ঢাকায় যেতে হয়। এতে সময়, অর্থ এবং ভোগান্তি—সবই বেড়ে যায়। হাসপাতালটি চালু হলে জেলার স্বাস্থ্যসেবায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
তবে আন্দোলনের ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও কম ছিল না। অনেক যাত্রী নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি। কর্মস্থলে যাওয়া, চিকিৎসাসেবা গ্রহণ এবং জরুরি কাজে বের হওয়া মানুষেরা দীর্ঘ যানজটে আটকা পড়ে চরম ভোগান্তির শিকার হন। অনেকেই শিক্ষার্থীদের দাবির যৌক্তিকতার প্রতি সমর্থন জানালেও জনদুর্ভোগ কমিয়ে বিকল্প উপায়ে আন্দোলন চালানোর আহ্বান জানান।
এদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তাদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেওয়া নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থের বিষয় সরকারের নজরে আনা। তারা আশা করছেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ দ্রুত আলোচনায় বসে হাসপাতাল চালু ও ক্লিনিক্যাল ক্লাস নিশ্চিত করার বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেবে।
সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কে এই অবরোধ কর্মসূচি আবারও স্বাস্থ্যখাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো দীর্ঘদিন চালু না হওয়ার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপই পারে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অবসান ঘটাতে এবং সুনামগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে।

