প্রকাশ: ১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জে এক দরিদ্র নারী গ্রাহকের হাতে পৌঁছেছে এমন এক বিদ্যুৎ বিল, যা দেখে হতবাক হয়ে পড়েছেন তিনি ও তার পরিবার। যেখানে প্রতি মাসে তার বিদ্যুৎ বিল আসত মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে, সেখানে হঠাৎ এক মাসের বিল দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৫৭ লাখ ৩৫ হাজার ১০৪ টাকা। অস্বাভাবিক এই বিলের কাগজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার নিজামপুর ইউনিয়নে। ওই এলাকার বাসিন্দা তানিয়া আক্তার সোমা নামের এক গ্রাহকের নামে বিদ্যুৎ অফিস থেকে পাঠানো বিলে কোটি টাকার বেশি পরিশোধযোগ্য অর্থ উল্লেখ করা হয়। সাধারণ একটি পরিবারের ব্যবহারের বিদ্যুৎ বিল হঠাৎ করে এত বিপুল পরিমাণ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন ওই নারী ও তার পরিবারের সদস্যরা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে পল্লী বিদ্যুতের নিয়মিত গ্রাহক। তাদের বাসায় বিদ্যুতের ব্যবহারও খুব সীমিত। মাস শেষে যে বিল আসে, তা সাধারণত ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যেই থাকে। কিন্তু চলতি মাসের বিল হাতে পাওয়ার পর তারা প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাসই করতে পারেননি। বিলের কাগজে কয়েক কোটি টাকার অংক দেখে তারা হতবাক হয়ে যান।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এত বড় অংকের টাকা পরিশোধ করা তাদের মতো সাধারণ পরিবারের পক্ষে কল্পনাতীত। প্রথমে তারা মনে করেছিলেন, হয়তো কোনো বড় ধরনের ভুল হয়েছে। পরে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য বিদ্যুৎ অফিসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন।
এরই মধ্যে বিলের কাগজের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই বিদ্যুৎ বিল তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং সাধারণ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে এমন ভুল যেন আর না ঘটে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
বিষয়টি নজরে আসে হবিগঞ্জ জেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তাদের। তারা বিলটি যাচাই-বাছাই করে দেখতে পান, এটি কোনো প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব নয়; বরং তথ্য এন্ট্রির সময় হওয়া একটি বড় ধরনের ভুলের কারণে বিলের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
হবিগঞ্জ জেলা পল্লী বিদ্যুতের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মো. জিল্লুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, কম্পিউটারে তথ্য ইনপুট দেওয়ার সময় সংখ্যাগত ভুলের কারণে বিলের পরিমাণ কোটি টাকার বেশি দেখানো হয়েছে। এটি প্রকৃত বিল নয়। ভুল শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, গ্রাহককে সংশোধিত বিল অনুযায়ী নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে হবে। ভুলের কারণে গ্রাহকের মধ্যে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত সমাধান করা হয়েছে।
পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, নতুন সফটওয়্যার ব্যবহারের শুরুর পর্যায়ে কিছু অপারেশনাল সমস্যার কারণে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল হয়েছে। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
জিএম মো. জিল্লুর রহমান বলেন, বিল প্রস্তুতের পুরো প্রক্রিয়া আরও সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এ ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় গ্রাহকের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বিদ্যুৎ বিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এমন ভুল সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের কাছে কোটি টাকার বিলের কাগজ পৌঁছানো মানসিক চাপ ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয়দের মতে, বর্তমানে বিদ্যুৎ বিল তৈরির বড় অংশই প্রযুক্তিনির্ভর। তাই সফটওয়্যারে তথ্য দেওয়ার সময় যেমন সতর্কতা প্রয়োজন, তেমনি বিল গ্রাহকের কাছে পাঠানোর আগে তা যাচাইয়ের ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা দরকার। তারা সংশ্লিষ্ট কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং বিল যাচাইয়ের একাধিক ধাপ চালুর দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ বিলের মতো জনসেবামূলক ব্যবস্থায় তথ্যের সামান্য ভুলও গ্রাহকের জন্য বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি মানবিক তদারকি ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
তানিয়া আক্তার সোমার ক্ষেত্রে বিষয়টি দ্রুত শনাক্ত ও সংশোধন করা হলেও ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, ডিজিটাল ব্যবস্থায়ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখতে সরকারি ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন ভুল এড়িয়ে চলার পাশাপাশি দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
হবিগঞ্জের এই ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চললেও আপাতত স্বস্তি ফিরেছে ওই পরিবারে। কোটি টাকার অস্বাভাবিক বিলের আতঙ্ক কেটে গিয়ে এখন তারা অপেক্ষা করছেন সংশোধিত প্রকৃত বিলের জন্য।


