প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হতে যাচ্ছে সিলেটে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের উন্নত চিকিৎসার দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণে এগিয়ে এসেছে চীন। বিনিয়োগের মাধ্যমে সিলেটে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট একটি বিশ্বমানের হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই বৃহৎ প্রকল্পের রূপরেখা তৈরি এবং সম্ভাব্য স্থান নির্বাচনের জন্য এরই মধ্যে চীনের একটি উচ্চপর্যায়ের বিনিয়োগকারী প্রতিনিধি দল সিলেট সফর করেছে। শ্রম, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী নিজে প্রতিনিধি দলটির সঙ্গে থেকে সিলেটের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে কেবল সিলেট নয়, বরং পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মান আমূল বদলে যাবে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
হাসপাতাল নির্মাণের এই প্রস্তাবটি বর্তমানে প্রাথমিক আলোচনার পর্যায়ে থাকলেও এর সম্ভাবনা নিয়ে ব্যাপক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। গত মঙ্গলবার মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে চীনা প্রতিনিধি দলটি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাসহ সিলেটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শন করে। মন্ত্রী তার নির্বাচনী এলাকা কোম্পানীগঞ্জে এই হাসপাতালটি নির্মাণের বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কারণ রয়েছে। আগের সরকারের আমলে শুরু করা কিন্তু বর্তমানে অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকা কোম্পানীগঞ্জ হাইটেক পার্কের বিশাল এলাকাটি মন্ত্রী হাসপাতাল প্রকল্পের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচনা করছেন। পরিত্যক্ত বা অর্ধসমাপ্ত অবকাঠামোকে আধুনিক ও বিশ্বমানের হাসপাতাল হিসেবে রূপান্তর করার এই পরিকল্পনাটি বিনিয়োগকারীদেরও নজর কেড়েছে।
পরিদর্শনের সময় চীনা প্রতিনিধি দলের সদস্য ‘বাই আপ ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড’র চেয়ারম্যান স্টোয়ার্ড চিওং এই স্থানের সম্ভাব্যতা যাচাই করে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। তার মতে, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং পর্যাপ্ত জায়গা থাকায় হাইটেক পার্কের বর্তমান অবকাঠামোটি হাসপাতালের জন্য একটি আদর্শ স্থান হতে পারে। তিনি জানিয়েছেন, প্রাথমিক পর্যালোচনায় তারা আশাবাদী এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে তাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এই বিনিয়োগ কেবল একটি হাসপাতাল নির্মাণ নয়, বরং এটি দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি নতুন সেতুবন্ধন তৈরি করবে। চীন বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগের জন্য সুপরিচিত, আর সেই অভিজ্ঞতা সিলেটে কাজে লাগাতে চায় তারা।
সিলেটের স্বাস্থ্যসেবা খাতের নাজুক অবস্থার কথা কারোরই অজানা নয়। এখানে বিশেষায়িত হাসপাতাল ও পর্যাপ্ত শয্যার অভাব দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয়দের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ জটিল রোগীর চিকিৎসার জন্য ঢাকা বা দেশের বাইরে যেতে হয়, যা মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের জন্য এক বিশাল আর্থিক বোঝা। এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালটি নির্মিত হলে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের জন্য রোগীদের আর রাজধানীমুখী হতে হবে না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পাশাপাশি আধুনিক রোগ নির্ণয় কেন্দ্র, অপারেশন থিয়েটার এবং উন্নত জরুরি সেবা বিভাগ এই হাসপাতালের অবিচ্ছেদ্য অংশ হবে। এর ফলে সিলেটের স্বাস্থ্যসেবা খাতে এক বিশাল শূন্যতা পূরণ হবে এবং সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশগত দিক এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি প্রতিনিধি দলকে আশ্বস্ত করেছেন যে, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসনের তরফ থেকে সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে। হাসপাতালের স্থান নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং স্থানীয় জনগণের চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। হাইটেক পার্কের অব্যবহৃত সম্পদকে জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করার এই সাহসী সিদ্ধান্তটি স্থানীয় মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। এটি যেমন সরকারি সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করবে, তেমনি এলাকাটির অর্থনৈতিক গুরুত্বকেও বাড়িয়ে দেবে।
হাসপাতাল নির্মাণের ফলে কেবল স্বাস্থ্যসেবাই উন্নত হবে না, বরং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এটি বড় ভূমিকা রাখবে। শত শত ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এছাড়া হাসপাতালকে কেন্দ্র করে কোম্পানীগঞ্জ ও এর আশপাশের এলাকায় ছোট-বড় অনেক সহযোগী শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। এতে করে এলাকাটি অচিরেই সিলেটের অন্যতম একটি স্বাস্থ্যসেবা ও বাণিজ্যিক হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। প্রবাসীদের শহর হিসেবে পরিচিত সিলেটে অনেক মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান, এই হাসপাতালটি তাদের সেবার মান পূরণ করে বিদেশি রোগীদেরও আকর্ষণ করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে এই প্রকল্পের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো দ্রুত ও মানসম্মত বাস্তবায়ন। প্রায়শই বড় বড় প্রকল্পে অর্থায়ন বা জমি হস্তান্তরের জটিলতায় কাজ থমকে যায়। কিন্তু এবার শুরু থেকেই উচ্চপর্যায়ের তদারকি থাকায় এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ জড়িত থাকায় প্রকল্পটি সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। চীনা বিনিয়োগকারীদের এই আগ্রহ সিলেটবাসীর মনে দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণের নতুন আশা জাগিয়েছে। পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুত যেন এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা যায়, সেই প্রত্যাশা সবার। এটি সম্পন্ন হলে সিলেটের ইতিহাসে এক স্মরণীয় মাইলফলক হয়ে থাকবে।
পরিশেষে বলা যায়, এক হাজার শয্যার এই হাসপাতাল প্রকল্প স্বাস্থ্যখাতে সরকারের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। জনগণের মৌলিক চাহিদার অন্যতম হলো সুচিকিৎসা। মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং চীনা প্রতিনিধি দলের আন্তরিকতায় প্রকল্পটি যদি আলোর মুখ দেখে, তবে সিলেটের স্বাস্থ্য মানচিত্র বদলে যেতে বাধ্য। এটি কেবল ইটের তৈরি একটি কাঠামো নয়, বরং হাজারো মানুষের জীবন রক্ষার এক দুর্গ হয়ে উঠবে। সিলেটবাসী এখন তাকিয়ে আছে কবে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে এবং তারা কবে নাগাদ এই আধুনিক চিকিৎসা সেবার সুফল ভোগ করতে পারবে। মানুষের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ রক্ষায় নেওয়া যেকোনো বৃহৎ উদ্যোগ সবসময়ই প্রশংসনীয়, আর সিলেটের এই হাসপাতাল হবে তার একটি শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।


