প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশজুড়ে নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার প্রতিবাদে সিলেটে রাজপথে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগ। নগরীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে অংশ নেন বিপুলসংখ্যক নারী, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
মানববন্ধনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের কেন্দ্রীয় ইউনিট সদস্য অধ্যাপিকা মাহফুজা সিদ্দিকা হান্নান এমপি। তিনি তার বক্তব্যে সাম্প্রতিক শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডসহ সারাদেশে ঘটে যাওয়া সহিংস অপরাধের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ছোট্ট শিশু রামিসার নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রতিফলন। তিনি অভিযোগ করেন, দেশে একের পর এক নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার নিশ্চিত হচ্ছে না, যা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে।
তিনি আরও বলেন, আজ পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সমাজের সর্বত্র শিশু ও নারীরা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলতে থাকলে সমাজে অস্থিরতা বাড়বে এবং জনগণ একসময় আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধ্য হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
কর্মসূচিতে বক্তারা দাবি করেন, কেবল ঢাকার ঘটনাই নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিনিয়তই নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, যেগুলো অনেক সময় প্রকাশ পায় না বা আলোচনার বাইরে থেকে যায়। এ অবস্থাকে তারা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
বক্তারা আরও বলেন, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা সমাজে ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করছে। অনেক মামলার বিচার শেষ হতে বছরের পর বছর লেগে যাচ্ছে, ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। তারা দাবি করেন, অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের অপরাধ আরও বাড়বে।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা ঢাকায় সাম্প্রতিক একটি শিশু হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ টেনে বলেন, এমন নৃশংস ঘটনার দ্রুত বিচার হওয়া উচিত, যাতে সমাজে একটি শক্তিশালী বার্তা যায়। একই সঙ্গে তারা সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলোর দ্রুত তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের পাশাপাশি মাদক ও অনলাইন পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাদের মতে, সামাজিক অবক্ষয় রোধে রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, চিকিৎসক, শ্রমিক প্রতিনিধি ও ছাত্রীরা। তারা সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জোরদারের দাবি জানান।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন সিলেট অঞ্চল মহিলা জামায়াতের পরিচালক শাহিমা খানম হেপি, প্রভাষক নাসিমা আক্তার বিউটি, নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. রাবেয়া বেগম এবং শ্রমিক নেত্রী সৈয়দা শিরিন বেগমসহ আরও অনেকে।
বক্তারা বলেন, বিচারহীনতার কারণে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে—এমন ধারণা সমাজে তৈরি হলে তা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। তাই দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর তারা গুরুত্বারোপ করেন।
তারা আরও বলেন, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের মৌলিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সামাজিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মানববন্ধন শেষে অংশগ্রহণকারীরা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি শেষ করেন এবং দাবি জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশের সব আলোচিত নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনার বিচার কার্যক্রম দৃশ্যমান করতে হবে।
সব মিলিয়ে সিলেটের এই কর্মসূচি শুধু একটি প্রতিবাদ সভা নয়, বরং সমাজে বিচার, নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের প্রশ্নে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নারী ও শিশু নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ যেমন স্পষ্ট হয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে চাপা অসন্তোষও আবার সামনে এসেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।


