প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
টানা গরম আর ভ্যাপসা আবহাওয়ার মধ্যে অবশেষে স্বস্তির বৃষ্টির আভাস মিলেছে সিলেট অঞ্চলে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সিলেটসহ দেশের কয়েকটি জেলায় আগামী ২৪ ঘণ্টায় মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দেশের কয়েকটি জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু তাপপ্রবাহও অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
সোমবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। আবহাওয়াবিদদের মতে, বর্তমানে দেশের আবহাওয়ায় মৌসুমি পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। বঙ্গোপসাগর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সৃষ্ট বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থার কারণে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মেঘের ঘনত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রভাবেই সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা জোরালো হতে শুরু করেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, একটি লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল অতিক্রম করে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এই বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মেঘ সঞ্চালন বৃদ্ধি করছে। বিশেষ করে সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে পাহাড়ি ঢল ও নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সিলেট অঞ্চলের মানুষ গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। দিনের বেলায় রোদের তীব্রতা যেমন ছিল চোখে পড়ার মতো, তেমনি রাতে গুমোট পরিবেশে স্বস্তির ঘুমও ছিল অনেকের কাছে কঠিন। এই অবস্থায় বৃষ্টির সম্ভাবনার খবরে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তির অনুভূতি তৈরি হয়েছে। নগরবাসীর পাশাপাশি কৃষকরাও আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে বোরো ধান কাটার শেষ পর্যায়ে থাকা কৃষকদের মতে, অতিরিক্ত বৃষ্টি না হলে এই বর্ষণ কৃষির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বিদ্যুৎ চমকানো এবং হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে রংপুর, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু এলাকাতেও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দু-এক জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে বৃষ্টি হতে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের আবহাওয়া পরিস্থিতিতে বজ্রপাতের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তাই খোলা মাঠ, নদী বা জলাশয়ের আশপাশে অবস্থানরত মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কৃষক, জেলে এবং নির্মাণশ্রমিকদের আবহাওয়ার সর্বশেষ তথ্য অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। বজ্রপাতের সময় বড় গাছের নিচে আশ্রয় না নেওয়া এবং বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে সতর্ক থাকার কথাও বলা হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যে আরও জানা গেছে, দেশের সাতটি জেলার ওপর দিয়ে বর্তমানে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। মাদারীপুর, রাজশাহী, পাবনা, লক্ষ্মীপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা ও যশোর জেলায় এই তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে। এসব অঞ্চলে দিনের তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকলেও দেশের অন্যান্য স্থানে বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। তবে রাতের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়াবিদরা মনে করছেন, বৃষ্টিপাত বাড়লেও বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকায় গুমোট ভাব পুরোপুরি কাটবে না। ফলে বৃষ্টি হলেও অনেক এলাকায় ভ্যাপসা গরমের অনুভূতি বজায় থাকতে পারে।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে খুলনার কয়রায়, যেখানে তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যদিকে একই সময়ে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে রংপুরে, যেখানে ৮০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টির প্রবণতা আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
সিলেটের স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই জানিয়েছেন, কয়েকদিন ধরেই আকাশে মেঘের আনাগোনা বাড়ছিল। দুপুরের পর হঠাৎ কালো মেঘ জমা হওয়া এবং গরম বাতাসের পরিবর্তে ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করায় বৃষ্টির পূর্বাভাস অনেকেই আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর হালকা বৃষ্টি ও মেঘগর্জনের ঘটনাও লক্ষ্য করা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবহাওয়ার আচরণ অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো দীর্ঘস্থায়ী খরা কিংবা অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ—সবকিছুই এখন তুলনামূলক ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরও বলছে, মৌসুমি বায়ুর আগমনের পূর্বমুহূর্তে এ ধরনের অস্থির আবহাওয়া স্বাভাবিক হলেও এর তীব্রতা আগের তুলনায় বেড়েছে।
এদিকে সিলেট অঞ্চলে ভারি বর্ষণের সম্ভাবনার খবরে স্থানীয় প্রশাসনও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছে। পাহাড়ি ঢল বা অতিবৃষ্টির কারণে যাতে কোনো ধরনের দুর্ভোগ সৃষ্টি না হয়, সেজন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে।
আবহাওয়া বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী কয়েকদিন দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। এতে তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও বজ্রঝড় ও আকস্মিক দমকা হাওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে। তাই সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনে খোলা জায়গায় অবস্থান না করা এবং আবহাওয়ার নিয়মিত আপডেট অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গরমের ক্লান্তিকর সময়ের মধ্যে সিলেটবাসীর জন্য এই সম্ভাব্য বৃষ্টি যেমন স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে, তেমনি অতিবৃষ্টির শঙ্কাও তৈরি করেছে নতুন উদ্বেগ। প্রকৃতির এই পরিবর্তনশীল আচরণের মধ্যেই এখন অপেক্ষা—স্বস্তির বৃষ্টি কতটা আশীর্বাদ হয়ে আসে, আর কতটা নতুন ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।


