প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
অতিবৃষ্টিতে ফসলহানির পর এবার গো-খাদ্য সংকটের চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষক ও খামারিরা। টানা জলাবদ্ধতা ও বৃষ্টিতে ধান তলিয়ে যাওয়ায় কাটা ফসলের খড় সংগ্রহ করতে না পারা এবং যা সংগ্রহ করা হয়েছিল তা সময়মতো শুকাতে না পারায় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন গবাদিপশু পালন নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন তারা। অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন বলেও জানা গেছে।
স্থানীয় কৃষক ও খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাওরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির একটি বড় অংশই গবাদিপশু নির্ভর। হালচাষ, দুধ-মাংসের চাহিদা পূরণ এবং কৃষকের আর্থিক স্বচ্ছলতার অন্যতম ভরসা গরু ও মহিষ পালন। তবে এবারের অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতায় ধানের ব্যাপক ক্ষতির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে গো-খাদ্যের উৎস খড়ের ওপর।
কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে গবাদিপশুর খাদ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে ধানের খড় থেকে। শুষ্ক মৌসুমে প্রাকৃতিক ঘাস কিছুটা সহায়তা করলেও বর্ষা মৌসুমের প্রায় ছয় মাস এই খড়ই প্রধান ভরসা। কিন্তু এবারের পরিস্থিতিতে ধান কাটা ও খড় সংগ্রহ উভয়ই ব্যাহত হয়েছে। যেসব জমির ধান আগেই পানিতে তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেগুলো থেকে আংশিকভাবে ধান কেটে আনা সম্ভব হলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে খড় ঠিকভাবে শুকানো যায়নি। ফলে বিপুল পরিমাণ খড় পচে নষ্ট হয়ে গেছে।
সদর উপজেলার জানিগাঁও গ্রামের ষাটোর্ধ্ব কৃষক সমছু মিয়া জানান, তার ছোট-বড় মিলিয়ে ৯টি গরু রয়েছে। প্রতিবছর বৈশাখ মাসে ধান কাটার পর খড় সংরক্ষণ করে তিনি সারা বছরের খাদ্য নিশ্চিত করেন। কিন্তু এবার জলাবদ্ধতায় ধান তলিয়ে যাওয়ায় পর্যাপ্ত খড় সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। যে সামান্য খড় শুকাতে পেরেছেন, তাও দুই মাসের বেশি সময় চলবে না বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
শান্তিগঞ্জ উপজেলার সলফ গ্রামের কৃষক রুহুল আমিন বলেন, ধানও যেমন পানিতে নষ্ট হয়েছে, তেমনি খড়ও সময়মতো তুলতে না পারায় পুরোপুরি পচে গেছে। এখন গরু পালন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে কিছু গরু কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, খড়ই হাওরাঞ্চলের প্রধান গো-খাদ্য। প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ উৎস নষ্ট হলে পুরো পশুপালন খাতই সংকটে পড়ে। অনেকেই এখন শেষ সম্বল হিসেবে রাখা গরু-মহিষ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ কৃষি উৎপাদনও হুমকির মুখে পড়ছে।
জানিগাঁও গ্রামের আরেক কৃষক রুকনুদ্দিন বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে যদি গো-খাদ্যের কোনো সহযোগিতা দেওয়া হয়, তাহলে অনেক কৃষক বাঁচতে পারবেন। এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে খাদ্যের অভাবে গরু বিক্রি করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে প্রতিবছর প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন খড় সংগ্রহ হয়। তবে চলতি বছরের অতিবৃষ্টিতে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে গো-খাদ্যের বাজারে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে অনেক জমির ধান তলিয়ে গেছে এবং যেটুকু ধান কাটা হয়েছে, তার খড়ও সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। এতে করে গো-খাদ্যের একটি ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে এখনই বড় ধরনের সংকট না হলেও সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
তিনি আরও জানান, খড়ের পাশাপাশি বিকল্প খাদ্য হিসেবে ভুসি, ধানের গুঁড়ো এবং অন্যান্য সম্পূরক খাদ্য ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকদের সচেতন করে তুলতে এবং বিকল্প খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে কাজ করা হচ্ছে।
কৃষি ও প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওর অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন প্রকট হচ্ছে। অতিবৃষ্টি, অকাল বন্যা এবং জলাবদ্ধতা শুধু ফসল নয়, পশুপালন ব্যবস্থাকেও বিপর্যস্ত করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বিকল্প গো-খাদ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা মনে করছেন, শুধু দুর্যোগের সময় নয়, আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে খড় সংরক্ষণে আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ে জরুরি খাদ্য সহায়তা এবং খামারিদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা না করলে অনেকেই গবাদিপশু পালনে আগ্রহ হারাতে পারেন।
সব মিলিয়ে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এবার ফসলহানির পর গো-খাদ্য সংকট নতুন এক দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকদের জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই খাতকে রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।


