প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় অভিযান চালিয়ে ছয়টি ভারতীয় গরু জব্দ করেছে পুলিশ। সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে চোরাই পথে গরু আনার অভিযোগের ভিত্তিতে পরিচালিত এ অভিযানে গরুগুলো জব্দ হলেও সংশ্লিষ্ট চোরাকারবারিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ঘটনাটি এলাকায় চোরাচালান রোধ ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলার আমুরোড বাজার এলাকা দিয়ে গরুগুলো নিয়ে যাওয়ার সময় সুন্দরপুর (করইঠিলা) এলাকায় পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে। চুনারুঘাট থানার উপ-পরিদর্শক মৃদুল হাসান তরফদারের নেতৃত্বে এই অভিযান চালানো হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে চোরাকারবারিরা গরুগুলো ফেলে দ্রুত পালিয়ে যায় বলে জানা গেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারে একটি চক্র সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে গরু এনে স্থানীয় বাজারে সরবরাহের চেষ্টা করছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ টহল জোরদার করে এবং সন্দেহভাজন স্থানে নজরদারি শুরু করে। একপর্যায়ে গরুগুলো বহন করে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের অভিযান শুরু হলে চোরাকারবারিরা দিকভ্রান্ত হয়ে গরুগুলো ফেলে পালিয়ে যায়।
প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, গরুগুলো ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে আনা হয়েছে। এরপর সেগুলো স্থানীয় বাজারে বিক্রি বা অন্য জেলায় সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। তবে পুলিশের সক্রিয় অভিযানের কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ছয়টি গরু জব্দ করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি আরও জানান, পলাতক চোরাকারবারিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সীমান্তবর্তী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই গরু পাচার একটি আলোচিত সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে বা ভোরের দিকে সীমান্ত দিয়ে গরু আনা-নেওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব গরু পরে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে একটি চক্র আর্থিকভাবে লাভবান হয়। তবে এই ধরনের অবৈধ কার্যক্রমের কারণে দেশীয় খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।
এ ঘটনায় স্থানীয় জনগণের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই পুলিশের এই অভিযানের প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গরু আনা বন্ধ না হলে স্থানীয় খামারিরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। কারণ বিদেশ থেকে আনা গরু তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করা হয়, যা স্থানীয় উৎপাদিত গরুর বাজারমূল্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
স্থানীয় সমাজসেবক আব্দুল আউয়াল মেম্বার বলেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ গরু আনা বন্ধ করতে না পারলে দেশীয় খামারিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের চোরাচালান শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই চোরাকারবারিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
সীমান্তবর্তী এলাকার সচেতন মহলের মতে, চোরাচালান রোধে শুধু পুলিশি অভিযানই যথেষ্ট নয়; বরং সীমান্ত নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অবৈধভাবে গরু আমদানি দেশের পশুসম্পদ খাতকে প্রভাবিত করে। এতে একদিকে স্থানীয় খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, অন্যদিকে সরকার রাজস্ব হারায়। বৈধ ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা জরুরি।
এদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জব্দ করা গরুগুলো থানায় রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা যায়।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই ধরনের অভিযান নিয়মিত হলে সীমান্ত এলাকায় গরু চোরাচালান অনেকাংশে কমে আসবে। এতে স্থানীয় খামারিরা উপকৃত হবেন এবং বাজারে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে চুনারুঘাটে ছয়টি ভারতীয় গরু জব্দের এই ঘটনা সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের সক্রিয়তার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, সীমান্ত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।


