প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের মোগলাবাজারে গভীর রাতে দুর্বৃত্তের ছোড়া অ্যাসিডে ঝলসে গেছে এক মা ও তার শিশু সন্তানের শরীরের বিভিন্ন অংশ। মর্মান্তিক এই ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে আহত মা ও ছেলে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁদের শারীরিক যন্ত্রণা যেমন অসহনীয়, তেমনি মানসিকভাবেও চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটছে পরিবারটির।
ঘটনার পর বৃহস্পতিবার মোগলাবাজার থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন আহত নারীর স্বামী ও শিশুটির বাবা মো. এমরান মিয়া। তিনি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সঞ্জবপুর এলাকার বাসিন্দা। পেশায় দিনমজুর এমরান অভিযোগে দাবি করেছেন, জমি দখলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে তাদের ভয়ভীতি ও উচ্ছেদের হুমকি দিয়ে আসছিল স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র। সেই বিরোধের জের ধরেই পরিকল্পিতভাবে এই অ্যাসিড হামলার ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।
অভিযোগে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের শিববাড়ী পৈত্যপাড়ার বাসিন্দা জিয়াউর রহমান, লালমাটিয়া ষাটঘর এলাকার রাসেল আহমদ এবং দক্ষিণ সুরমার জৈনপুর চান্দাই এলাকার সুজন। এ ছাড়া আরও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।
পরিবারটির দাবি, গত সাত মাস ধরে তাঁরা সিলেট নগরীর লালমাটিয়া ষাটঘর এলাকায় পর্তুগালপ্রবাসী এক ব্যক্তির জমিতে বসবাস করছিলেন। এমরান দিনমজুরির পাশাপাশি ওই জমির দেখাশোনার দায়িত্বও পালন করতেন। কিন্তু অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে জমিটি দখলের চেষ্টা করে আসছিলেন। এ নিয়ে একাধিকবার তাঁদের হুমকি দেওয়া হয়। প্রতিবাদ করলে হামলার ভয়ও দেখানো হতো।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার দিবাগত রাত ছিল অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিক। রাত সাড়ে ১২টার দিকে এমরান মিয়া পাশের একটি দোকানে পান খেতে যান। কিছুক্ষণ পর বাড়ি ফেরার পথে তিনি ঘরের পাশ দিয়ে কয়েকজনকে দ্রুত দৌড়ে পালিয়ে যেতে দেখেন। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তিনি দ্রুত ঘরে প্রবেশ করেন। ভেতরে ঢুকেই দেখতে পান, তাঁর স্ত্রী খাদিজা বেগম ও ১১ বছর বয়সী ছেলে বায়েজিদ আহমদের শরীরের বিভিন্ন অংশ ঝলসে গেছে। যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন মা ও ছেলে।
ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা একটি মোবিলের বোতল ও প্লাস্টিকের ছোট গ্লাস দেখে তাঁর সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। তিনি জানান, ঘরে পোড়া গন্ধও পাওয়া যাচ্ছিল এবং বিছানার তোষকের একটি অংশ দগ্ধ হয়ে যায়। এমরানের চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে গুরুতর আহত মা ও শিশুকে দ্রুত সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, খাদিজা বেগমের শরীরের কয়েকটি অংশে গভীর দাহের চিহ্ন রয়েছে। তাঁর ছেলে বায়েজিদের মুখমণ্ডল ও শরীরের বিভিন্ন অংশও অ্যাসিডে আক্রান্ত হয়েছে। চিকিৎসকেরা তাঁদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মা ও শিশুর আর্তনাদ উপস্থিত অন্য রোগী ও স্বজনদেরও ভারাক্রান্ত করে তুলছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে বলছেন, এলাকায় জমি দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই উত্তেজনা দেখা যায়। তবে নারী ও শিশুকে লক্ষ্য করে এমন নৃশংস হামলার ঘটনায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তাঁদের দাবি, দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে ঘটনার পরপরই মোগলাবাজার থানা পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে আহতদের খোঁজখবর নেয়। মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। আহতদের চিকিৎসা ও অভিযোগের ভিত্তিতে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, অ্যাসিড হামলা শুধু শারীরিক নির্যাতন নয়, এটি একটি ভয়াবহ মানসিক সহিংসতাও। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অতীতে অ্যাসিড সন্ত্রাসের ঘটনা কমে এলেও বিচ্ছিন্নভাবে এখনও এমন হামলার খবর পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিশোধের কারণে অনেক সময় দুর্বৃত্তরা অ্যাসিডকে ভয়ংকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। এ ধরনের অপরাধ দমনে কঠোর আইন থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, নারী ও শিশুকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা সমাজে অপরাধ প্রবণতার গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় পরিবারগুলো অনেক সময় প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না। ফলে ভয়ভীতি ও দখলবাজির মতো অপরাধ বেড়ে যায়। এমরান মিয়ার পরিবারও তেমনই এক অসহায় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বর্তমানে হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের একটি বেডেই কাটছে খাদিজা বেগম ও তাঁর ছেলের দিনরাত। স্বজনদের চোখে উদ্বেগ, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার ছাপ স্পষ্ট। শিশুপুত্র বায়েজিদ মাঝে মধ্যেই মায়ের দিকে তাকিয়ে কান্না করছে। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, শারীরিক যন্ত্রণার চেয়ে এখন তাঁদের বড় ভয় নিরাপত্তা নিয়ে। কারণ অভিযুক্তরা এখনও এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে চলেছে বলে তাঁদের দাবি।
এমরান মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। কোনো রকমে দিনমজুরি করে সংসার চালাই। আমার স্ত্রী আর ছেলের কী অপরাধ ছিল? যারা এই কাজ করেছে, আমি তাদের বিচার চাই।”
এই নির্মম ঘটনার পর স্থানীয়দের একটাই প্রত্যাশা—দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আইনের মুখোমুখি করা হোক এবং আহত মা ও শিশুর যথাযথ চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। কারণ একটি সভ্য সমাজে কোনো বিরোধ বা দখলসংক্রান্ত দ্বন্দ্বের পরিণতি কখনোই এমন ভয়াবহ ও অমানবিক হতে পারে না।


