প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৬ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আলোচনায় আসা জামায়াতে ইসলামীর নেতা মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবার দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগর প্রশাসনের একটিতে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিতে যাচ্ছেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে তাকে। বর্তমানে তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটগত রাজনীতির কৌশল গ্রহণ করলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে ভিন্ন পরিকল্পনায় এগোচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দলটি এবার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি যাচাই করতে চায়। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত করার কাজও অনেকটাই এগিয়ে নিয়েছে তারা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতের এমন সক্রিয় প্রস্তুতি দেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
দলীয় একাধিক সূত্র বলছে, প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এবার তরুণ নেতৃত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন ও গণ–অভ্যুত্থানের সময় সক্রিয় থাকা ছাত্রনেতাদের স্থানীয় সরকার রাজনীতিতে সামনে আনার কৌশল নিয়েছে দলটি। এ কারণে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক অনেক নেতাও সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে, জামায়াত তাদের পুরোনো সাংগঠনিক নীতিতেও কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। আগে কেবল রুকন বা শপথধারী সদস্যদেরই দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার প্রবণতা থাকলেও এখন সেই অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসেছে দলটি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কর্মী-সমর্থক এমনকি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদেরও মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একই কৌশল অনুসরণ করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন দলটির নেতারা।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের নাম সামনে আসার পর রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। সিলেটের রাজনীতি থেকে উঠে এসে রাজধানীকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এই নেতা দীর্ঘদিন ধরেই জামায়াতের সাংগঠনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। বিশেষ করে ঢাকা মহানগর উত্তর এলাকায় দলকে পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ইতিবাচক মূল্যায়ন রয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিয়ে আলোচনায় রয়েছেন ডাকসুর সাবেক ভিপি আবু সাদিক, যিনি সাদিক কায়েম নামেই বেশি পরিচিত। তাকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সমালোচনার জবাবে জামায়াতের নেতারা বলছেন, নির্বাচনের সময়ের মধ্যে তার ডাকসুর মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে এবং ছাত্রত্ব শেষ হলে ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক পরিচয়ের সঙ্গেও তিনি আর যুক্ত থাকবেন না। ফলে প্রার্থী হতে সাংগঠনিকভাবে কোনো বাধা থাকবে না।
ঢাকা দক্ষিণে সম্ভাব্য জোট রাজনীতি নিয়েও আলোচনা রয়েছে। দলীয় সূত্র জানায়, এনসিপির পক্ষ থেকে তাদের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে জোটের প্রার্থী করার একটি প্রস্তাব এসেছিল। তবে জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা সেই প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের এক নেতা বলেন, উপদেষ্টা থাকাকালে আসিফ মাহমুদের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তাকে সমর্থন দিলে রাজনৈতিক দায়ভার জামায়াতকেই নিতে হতে পারে বলে মনে করছেন তারা। ফলে ঢাকা দক্ষিণে সমঝোতার সম্ভাবনা কম বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে কয়েকটি সিটিতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করতে বলা হয়েছে। দলীয় দায়িত্বশীল সমাবেশেও কিছু নাম ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন মহানগর জামায়াতের আমির আবদুল জব্বার। তিনি অতীতে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেও ছিলেন। গাজীপুর সিটিতে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন তুরস্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হাফিজুর রহমান, যিনি ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রশিবিরের সাবেক সেক্রেটারি। চট্টগ্রামে আলোচনায় রয়েছেন সাবেক কাউন্সিলর ও নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুজ্জামান হেলালী। রংপুরে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনায় আছেন মহানগর আমির এ টি এম আজম খান।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১–দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছেন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দলীয় প্রার্থীদের চূড়ান্ত করা হচ্ছে। প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিছু এলাকায় ১১–দলীয় ঐক্যের শরিকদের সঙ্গে সমঝোতা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত।
দলটির আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আপাতত ১১–দলীয় ঐক্যভুক্ত প্রতিটি দল নিজ নিজ প্রার্থী দেওয়ার অবস্থানেই রয়েছে। ফলে নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে রাজনৈতিক সমীকরণ আরও স্পষ্ট হবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামীর এই প্রস্তুতি দলটির নতুন রাজনৈতিক কৌশলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনা, সাংগঠনিক নীতিতে নমনীয়তা এবং বড় শহরগুলোতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে দলটি নিজেদের নতুনভাবে উপস্থাপন করতে চাইছে। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করা হয় কি না এবং হলে রাজধানীর নির্বাচনী রাজনীতিতে তিনি কতটা প্রভাব ফেলতে পারেন।


