প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরীর প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এখন আধুনিক স্থাপত্যশৈলী, নান্দনিক সৌন্দর্য ও ব্যতিক্রমধর্মী নির্মাণকৌশলের কারণে দেশজুড়ে আলোচনায়। প্রায় ৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাটি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী আসাম টাইপ বাড়ি এবং আলী আমজদের ঘড়ির স্থাপত্যরীতিকে ধারণ করে আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের অনন্য সমন্বয় ঘটিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই টার্মিনালকে দেশের অন্যতম আধুনিক বাস টার্মিনাল হিসেবেও আখ্যায়িত করা হচ্ছে। কিন্তু বাহ্যিক চাকচিক্য আর স্থাপত্যের নান্দনিকতার আড়ালে প্রতিদিন বেড়ে চলেছে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ, যানজট এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, টার্মিনালের ভেতরে নির্ধারিত পার্কিং সুবিধা থাকলেও অধিকাংশ বাস সড়কের দুই পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে। কদমতলী থেকে কিনব্রিজ পর্যন্ত পুরো সড়কজুড়ে দীর্ঘ সারিতে বাস, কোচ, মিনিবাস ও অন্যান্য পরিবহন দাঁড়িয়ে থাকে। সড়কের পাশে থাকা দোকানপাটের সামনের ফাঁকা জায়গা, রেলস্টেশনের প্রবেশমুখ, এমনকি আশপাশের ছোট ছোট গলিপথও পরিণত হয়েছে অস্থায়ী পার্কিং এলাকায়। ফলে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পুরো এলাকাজুড়ে লেগেই থাকে তীব্র যানজট।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণ হলেও পরিকল্পনার ঘাটতি ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। যাত্রী ও পথচারীদের চলাচলের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ, বিশেষ করে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যানবাহনের ভিড়ের মধ্য দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন।
টার্মিনাল এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, সড়কের পাশে দীর্ঘ সময় বাস দাঁড়িয়ে থাকায় দোকানে ক্রেতা আসা কমে গেছে। যানজটের কারণে মানুষ সহজে থামতে পারেন না। একই সঙ্গে ধোঁয়া, শব্দদূষণ ও বিশৃঙ্খল পরিবেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল যানবাহনকে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার আওতায় আনা, কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো চিত্রই দেখা যাচ্ছে।
দক্ষিণ সুরমা এলাকার বাসিন্দারা আরও অভিযোগ করেন, টার্মিনালের আশপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অনিয়ন্ত্রিত ওয়ার্কশপ। এসব ওয়ার্কশপের বিকল গাড়ি দিনের পর দিন রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হয়। অনেক সময় রাস্তার ওপরই মেরামতের কাজ চলতে দেখা যায়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড, সিএনজি অটোরিকশার স্ট্যান্ড এবং বিভিন্ন পরিবহনের অস্থায়ী কাউন্টার। সব মিলিয়ে পুরো এলাকাই যেন বিশাল এক অগোছালো পরিবহন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
রেলস্টেশনের যাত্রীদের দুর্ভোগও কম নয়। সিলেট রেলস্টেশনের প্রবেশপথের দুই পাশে বড় বড় বাস দাঁড়িয়ে থাকায় যাত্রীদের যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। বিশেষ করে ট্রেন আসা বা ছাড়ার সময় এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। তখন অনেক যাত্রীকে ব্যাগ হাতে দীর্ঘ পথ হেঁটে স্টেশনে যেতে দেখা যায়। স্থানীয়রা বলছেন, জরুরি পরিস্থিতিতে অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি দ্রুত চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ করলেই একটি পরিবহন টার্মিনাল কার্যকর হয় না; প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা, কঠোর নজরদারি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সড়কের দুই পাশে অবৈধ পার্কিং বন্ধ না হলে কিংবা যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, টার্মিনালকে কেন্দ্র করে যে বিপুল যানবাহন চলাচল করছে, তার জন্য আলাদা পার্কিং জোন, নির্দিষ্ট ওয়ার্কশপ এলাকা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সিলেট জেলার সভাপতি ময়নুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, বর্তমানে তাদের অধীনে প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ বাস চলাচল করে। কিন্তু টার্মিনালের ভেতরে সর্বোচ্চ ২৫০ থেকে ৩০০টি গাড়ি রাখা সম্ভব। ফলে বাধ্য হয়েই বাকি গাড়িগুলো সড়কের পাশে রাখতে হচ্ছে। তিনি জানান, টার্মিনালের ভেতরে জায়গা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশনকে আগেই অবহিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, শুধুমাত্র জায়গার সংকটকে দায়ী করলে সমস্যার সমাধান হবে না। টার্মিনালের কার্যক্রম পরিচালনায় সমন্বয়হীনতা এবং নিয়ম বাস্তবায়নের অভাবও বড় কারণ। তারা মনে করেন, প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন, ট্রাফিক বিভাগ ও পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই দুর্ভোগ কমানো সম্ভব নয়।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি আধুনিক টার্মিনাল যদি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে না পারে, তবে সেই উন্নয়নের প্রকৃত সুফল কোথায়। কেউ কেউ বলছেন, দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার পাশাপাশি কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে এই উন্নয়ন কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
সিলেটবাসীর প্রত্যাশা ছিল, নতুন কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল চালু হলে নগরীর যানজট কমবে, পরিবহন ব্যবস্থা হবে আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং যাত্রীসেবা উন্নত হবে। কিন্তু বাস্তবে এখনও প্রতিদিন ভোগান্তি নিয়ে পথ চলতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। তাই এখন প্রশ্ন উঠেছে, শুধু আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণই কি যথেষ্ট, নাকি এর সঙ্গে প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা?
সংশ্লিষ্টদের মতে, টার্মিনালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবৈধ পার্কিং বন্ধ, সড়কের পাশে গড়ে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত ওয়ার্কশপ অপসারণ এবং সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। অন্যথায় আধুনিক স্থাপত্যের এই টার্মিনাল হয়তো সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবেই থাকবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের চিত্র বদলাবে না।


