প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ডিজিটাল যোগাযোগের এই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপ মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রযুক্তির এই বিস্তৃত ব্যবহারের পাশাপাশি বাড়ছে সাইবার অপরাধের ঝুঁকিও। বিশেষ করে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী কিংবা পরিচিত সামাজিক ব্যক্তিদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে প্রতারণার ঘটনা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবার সেই সাইবার হামলার শিকার হয়েছেন সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী।
মঙ্গলবার বিকেলে হঠাৎ করেই তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় হ্যাকারদের হাতে। বিষয়টি প্রথমে টের না পেলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বুঝতে পারেন যে তার অ্যাকাউন্টে অননুমোদিত প্রবেশ ঘটেছে। পরে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক প্রতারণা বা ক্ষয়ক্ষতির আগেই অ্যাকাউন্টটি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন তিনি।
ঘটনার পর ইমদাদ হোসেন চৌধুরী নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে অনুসারী, সহকর্মী ও পরিচিতদের সতর্ক করেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার বিকাল পৌনে ৪টার দিকে তিনি বুঝতে পারেন যে তার হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে। এরপর আর দেরি না করে দ্রুত কোতোয়ালী মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ নেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যাকাউন্টটি হ্যাক হওয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই হ্যাকাররা সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা তার পরিচিত বিভিন্ন ব্যক্তি ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে অর্থ সহায়তা চেয়ে বার্তা পাঠাতে শুরু করে। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় কয়েকজন সরাসরি তাকে ফোন করে বিষয়টি যাচাইয়ের চেষ্টা করেন। এ কারণে সম্ভাব্য প্রতারণা থেকে অনেকে রক্ষা পান।
ইমদাদ চৌধুরী বলেন, আল্লাহর রহমতে তিনি দ্রুত পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছিলেন। ফলে কেউ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই তিনি অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পান। একইসঙ্গে বিষয়টি দ্রুত জনসম্মুখে তুলে ধরতে পারায় অনেকেই সতর্ক হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ঘটনার পর বিভিন্ন গণমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তার অ্যাকাউন্ট হ্যাকের খবর প্রকাশিত হয়। অনেক গণমাধ্যম ফটোকার্ড ও সতর্কতামূলক বার্তা প্রকাশ করে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা চালায়। এজন্য সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাকিংয়ের অন্যতম সাধারণ কৌশল হচ্ছে ভুয়া ওটিপি বা ভেরিফিকেশন কোড সংগ্রহ করা। অনেক সময় পরিচিত কারও পরিচয় ব্যবহার করে বা ভুয়া লিংকের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে গোপন তথ্য হাতিয়ে নেয় হ্যাকাররা। একবার অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে গেলে তারা পরিচিতদের কাছে অর্থ দাবি, ভুয়া বার্তা পাঠানো কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক নেতা ও পরিচিত ব্যক্তিদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে ঝুঁকি আরও বেশি থাকে। কারণ সাধারণ মানুষ তাদের পরিচয় বিশ্বাস করে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখান। ফলে প্রতারকরা সহজেই অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্বের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার ঘটনাও বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে ব্যবহারকারীদের আরও সচেতন হওয়া জরুরি। বিশেষ করে হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্য কোনো অ্যাপে আসা ভেরিফিকেশন কোড কখনও অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার না করা, টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন চালু রাখা এবং সন্দেহজনক লিংকে প্রবেশ থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিচিত কেউ হঠাৎ করে অর্থ সহায়তা চাইলে সেটি যাচাই না করে কোনো আর্থিক লেনদেন না করার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
ইমদাদ হোসেন চৌধুরীর ঘটনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও জনসচেতনতা বড় ধরনের প্রতারণা ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি দ্রুত থানায় জিডি করা, সামাজিক মাধ্যমে সতর্কবার্তা দেওয়া এবং পরিচিতদের অবহিত করার ফলে সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা অনেকটাই কমে এসেছে।
সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনেও ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থার এই সময়ে সাইবার নিরাপত্তা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু রাজনৈতিক নেতারাই নন, সাধারণ মানুষও প্রতিনিয়ত সাইবার অপরাধের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা বাড়লেও এখনও অনেক ব্যবহারকারী মৌলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো অনুসরণ করেন না। ফলে হ্যাকাররা সহজেই সুযোগ পেয়ে যায়। প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়ছে, সাইবার অপরাধও তত আধুনিক হচ্ছে। তাই ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকেও ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
ঘটনার পর অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করে বলেছেন, অল্প সময়ের মধ্যেই অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধার করতে পারাটা ছিল ইতিবাচক দিক। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা বিষয়টি বুঝতে বুঝতেই প্রতারকরা বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করে ফেলে। এ ঘটনায় সচেতনতা তৈরির বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
সবশেষে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন যোগাযোগ এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন হওয়াও সমান জরুরি। ইমদাদ হোসেন চৌধুরীর হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাকের ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিল—একটি ছোট অসতর্কতাও বড় ধরনের বিপদের কারণ হতে পারে।


