প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগরের এক কিশোরীর সাফল্যে আনন্দ আর গর্বে ভাসছে পুরো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং স্থানীয় মানুষ। অনলাইনভিত্তিক জাতীয় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সিলেট বিভাগীয় পর্যায়ে সেরা ১০০ জনের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে মো. উস্তওয়ার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী নুজহাত হাসান। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে শুরু হওয়া তার পথচলা এখন নতুন এক স্বপ্নের দুয়ার খুলে দিয়েছে।
দেশব্যাপী স্কুল পর্যায়ের এই অনলাইন চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ‘আর্ট বাংলাদেশ’। সরকারি উদ্যোগের আওতায় পরিচালিত প্রতিযোগিতাটিতে দেশের বিভিন্ন জেলার হাজারো শিক্ষার্থী অংশ নেয়। সেখান থেকে ধাপে ধাপে উপজেলা, জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে বাছাই করা হয় সেরা প্রতিযোগীদের। প্রতিযোগিতার প্রতিটি ধাপেই নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে এগিয়ে গেছে শমশেরনগরের এই কিশোরী।
নুজহাত হাসান স্থানীয়ভাবে বেশ পরিচিত একটি পরিবারের সন্তান। তিনি দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার কমলগঞ্জ প্রতিনিধি কামরুল হাসান মারুফের মেয়ে। পরিবার থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি উৎসাহ পেয়েছেন বলে জানান তার স্বজনরা। ছোটবেলা থেকেই রঙ, কাগজ আর তুলির প্রতি তার আলাদা টান ছিল। বইয়ের পাতার ফাঁকে, খাতার কোণে কিংবা অবসরে সে প্রায়ই ছবি আঁকত। সেই আগ্রহই ধীরে ধীরে তাকে প্রতিযোগিতার মঞ্চে নিয়ে আসে।
প্রথমে উপজেলা পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় নুজহাত। সেখানে তার আঁকা ছবি বিচারকদের নজর কাড়ে। পরে জেলা পর্যায়েও সেরা প্রতিযোগীদের তালিকায় স্থান করে নেয় সে। এরপর বিভাগীয় পর্যায়ে অংশ নিয়ে আবারও নিজের মেধা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দেয়। সবশেষে সিলেট বিভাগের সেরা ১০০ জনের মধ্যে জায়গা করে নিয়ে শমশেরনগর তথা কমলগঞ্জ উপজেলার জন্য একটি গৌরবের মুহূর্ত তৈরি করেছে সে।
এই অর্জনের পর বিদ্যালয়জুড়ে আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে স্থানীয় মানুষও নুজহাতের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত। বিদ্যালয়ের সহপাঠীরা বলছে, নুজহাত শুধু তাদের বন্ধু নয়, পুরো স্কুলের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। তার এই সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদেরও সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করবে।
নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে নুজহাত হাসান বলে, এই অর্জনে সে খুবই আনন্দিত। তার ভাষায়, এ বছর খুব বেশি প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ হয়নি। তারপরও বিভাগীয় পর্যায়ে জায়গা করে নিতে পেরে সে গর্ব অনুভব করছে। আগামী বছর আরও ভালো প্রস্তুতি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখছে বলেও জানায় সে।
নুজহাতের সহপাঠী নাফিছা ও নুসরাতসহ অনেকেই বলেছে, তাদের স্কুল থেকে একজন শিক্ষার্থী বিভাগীয় পর্যায়ে সাফল্য পাওয়ায় তারা খুব খুশি। এটি শুধু একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, পুরো বিদ্যালয়ের জন্য সম্মান ও গর্বের বিষয়। তারা আশা করছে, ভবিষ্যতে আরও শিক্ষার্থী বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে এমন সাফল্য অর্জন করবে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরে আলম সিদ্দিক বলেন, নুজহাতের এই অর্জন বিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত গর্বের। তিনি জানান, নুজহাত ছোটবেলা থেকেই সৃজনশীল ও মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত। তার ভেতরে শিল্পচর্চার যে প্রতিভা রয়েছে, সেটিকে আরও বিকশিত করতে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। তিনি মনে করেন, সঠিক পরিচর্যা পেলে নুজহাত ভবিষ্যতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সাফল্য বয়ে আনতে পারবে।
কমলগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সামসুন নাহার পারভীনও নুজহাতের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, কমলগঞ্জ উপজেলার একজন শিক্ষার্থী সিলেট বিভাগীয় পর্যায়ে জায়গা করে নেওয়াটা অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। এটি শুধু একটি বিদ্যালয়ের নয়, পুরো উপজেলার জন্য গর্বের। তিনি খুব শিগগিরই বিদ্যালয়ে গিয়ে নুজহাতকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাবেন বলেও জানিয়েছেন।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, বর্তমানে শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল বিকাশের জন্য চিত্রাঙ্কন, সংগীত, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক চর্চার বিকল্প নেই। পড়াশোনার পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকলে শিশুদের মানসিক বিকাশ আরও সুস্থ ও ইতিবাচক হয়। বিশেষ করে ডিজিটাল যুগে মোবাইল ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ততার মধ্যে শিল্পচর্চা নতুন প্রজন্মকে মানবিক ও সৃজনশীল করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরাও বলছেন, গ্রামাঞ্চলের অনেক প্রতিভাবান শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত সুযোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সামনে এগোতে পারে না। নুজহাতের মতো শিক্ষার্থীরা সুযোগ পেলে জাতীয় পর্যায়েও নিজেদের মেধার পরিচয় দিতে সক্ষম হবে। তাই স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নুজহাতের সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই তাকে অভিনন্দন জানিয়ে শুভকামনা প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ লিখেছেন, মফস্বল শহরের ছোট্ট একটি স্কুল থেকেও যে বড় স্বপ্ন দেখা যায়, নুজহাত তারই উদাহরণ।
একটি ছবি কখনও কখনও শুধু রঙের সমাহার নয়, সেটি হয়ে ওঠে স্বপ্ন, অনুভূতি আর ভবিষ্যতের সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি। শমশেরনগরের নুজহাত হাসানের এই সাফল্যও যেন তেমনই একটি গল্প—যেখানে সীমিত সুযোগের মধ্যেও প্রতিভা নিজের আলো ছড়িয়ে দেয়। এখন তার সামনে আরও বড় পথ, আরও বড় স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নের পথচলায় তার পাশে দাঁড়িয়েছে পরিবার, বিদ্যালয় এবং পুরো কমলগঞ্জ।


