প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট সদর উপজেলার শান্ত একটি গ্রাম সোনাতলা পশ্চিমপাড়া। সাধারণ মানুষের বসবাস, দিনমজুরের সংসার, ছোট ছোট শিশুদের খেলাধুলা আর প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মধ্যেই হঠাৎ নেমে আসে এক ভয়াবহ শোকের ছায়া। মাত্র চার বছরের শিশু ফাহিমা আক্তারের নির্মম হত্যাকাণ্ড পুরো এলাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। প্রতিবেশী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ষণের চেষ্টা ও হত্যার অভিযোগ সামনে আসার পর শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়েও সৃষ্টি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনার ঝড়।
নিহত ফাহিমা দিনমজুর রইসুল হকের মেয়ে। পরিবারটির আর্থিক অবস্থা খুবই সাধারণ হলেও আদরের মেয়েকে ঘিরে ছিল অনেক স্বপ্ন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ফাহিমা ছিল অত্যন্ত চঞ্চল ও হাসিখুশি একটি শিশু। প্রতিদিনের মতো সেদিনও সে বাড়ির আশপাশে খেলাধুলা করছিল। কিন্তু সেই দিনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ঘটনা, যা পুরো এলাকাকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
এ ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে একই এলাকার বাসিন্দা জাকির হোসেনকে। তিনি মৃত তোতা মিয়ার ছেলে এবং নিহত শিশুটির প্রতিবেশী। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন। মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে এসএমপির উপকমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, অভিযুক্তের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৬ মে সকাল প্রায় ১১টার দিকে জাকির তার ঘরে একা ছিলেন। সে সময় ছোট্ট ফাহিমাকে ২০ টাকা দিয়ে বাড়ির সামনে একটি দোকান থেকে দুটি সিগারেট এনে দিতে বলা হয়। শিশুটি সিগারেট এনে দেওয়ার পর অভিযুক্ত তাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে যায়। পরে ঘরের শয়নকক্ষের দরজা বন্ধ করে তার ওপর নির্যাতনের চেষ্টা চালানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একপর্যায়ে শিশুটি অজ্ঞান হয়ে পড়ে। এরপর গলাটিপে তাকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছে অভিযুক্ত। হত্যার পর ঘটনাটি গোপন করার জন্য মরদেহ একটি শাল দিয়ে জড়িয়ে সুটকেসের ভেতরে রাখা হয়। প্রথমে সেটি ঘরের একটি ক্যাবিনেটের ওপর রাখা হলেও পরে আবার বের করে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়।
পুলিশ জানায়, ঘটনার দুই দিন পর ভোররাতে মরদেহ গুম করার চেষ্টা করা হয়। অভিযুক্ত প্রথমে পাশের একটি ডোবায় লাশ ফেলে দেয়। কিন্তু মরদেহ পানিতে ভেসে উঠলে সেটি আবার তুলে এনে পুকুরপাড়ের বাঁশঝাড় ও নারিকেল গাছের নিচে ফেলে রাখা হয়। পরে স্থানীয় লোকজন সন্দেহজনক অবস্থায় মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে।
ঘটনার পরপরই এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সোমবার রাতে জাকির হোসেনকে গ্রেফতারের খবর জানাজানি হলে বিক্ষুব্ধ জনতা জালালাবাদ থানা ঘেরাও করে। স্থানীয়দের একটি অংশ অভিযুক্তের দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করে। পরে উত্তেজিত কিছু লোক অভিযুক্তের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায় বলেও জানা গেছে।
মঙ্গলবার আদালতে হাজির করার পর জাকির হোসেনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের স্বার্থে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, অভিযুক্তের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে টেকেরবাড়ি এলাকার একটি খাল থেকে মরদেহ গুমের চেষ্টায় ব্যবহৃত একটি শাল উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া অভিযুক্তের বাড়ি থেকে একটি কালো সুটকেস এবং খাটের নিচ থেকে রক্তমাখা বালিও উদ্ধার করা হয়েছে। এসব আলামত পরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনার পর থেকেই ফাহিমার পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক। স্বজনদের আহাজারিতে বারবার ভারী হয়ে উঠছে পুরো এলাকা। শিশুটির মা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। প্রতিবেশীদের অনেকেই বলছেন, এমন নির্মম ঘটনার কথা তারা আগে কখনও কল্পনাও করেননি। গ্রামের মানুষ এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না, পরিচিত একজন প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে এমন ভয়াবহ অভিযোগ উঠতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে শিশু নিরাপত্তা, সামাজিক অবক্ষয় এবং আইনের দ্রুত প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। বিশেষ করে শিশুদের প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। মানবাধিকারকর্মীদের একটি অংশ বলছেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, পরিবার ও সমাজের সচেতনতাও জরুরি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাও বলছেন, শিশুদের প্রতি সহিংসতার ঘটনা প্রতিরোধে পরিবার, প্রতিবেশী ও স্থানীয় সমাজকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিচিত মানুষদের মাধ্যমেও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে বলে এখন অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। শিশুদের একা কোথাও পাঠানো, অপরিচিত বা অল্প পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে সময় কাটানো এবং নিরাপত্তাহীন পরিবেশে অবাধ চলাফেরার বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এদিকে, সিলেটজুড়ে আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের অপরাধ বন্ধ করা কঠিন হবে। একইসঙ্গে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।
চার বছরের ছোট্ট ফাহিমা আর কখনও খেলতে বের হবে না, মায়ের কোলে ফিরে আসবে না। কিন্তু তার মৃত্যুর ভয়াবহতা আবারও সমাজকে কঠিন এক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে—শিশুরা কতটা নিরাপদ? সোনাতলা পশ্চিমপাড়ার এই নির্মম ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছে।


