প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের বাহুবলে আলোচিত গৃহবধূ নাজমা আক্তার হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসছে। প্রায় সাত মাস আগে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে শুরু থেকেই এলাকায় নানা গুঞ্জন, সন্দেহ ও উত্তেজনা ছিল। প্রথমদিকে যাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল, তদন্তের অগ্রগতিতে এখন সেই ঘটনার পেছনে ভিন্ন চিত্র উঠে আসছে বলে জানিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংস্থাটির দাবি, পারিবারিক বিরোধ, প্রতিশোধ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থকে কেন্দ্র করেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।
পিবিআই সূত্র বলছে, নিহত নাজমা আক্তারের সতীনের ভাই আব্দুল গনি এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী বলে তদন্তে উঠে এসেছে। শুধু হত্যাকাণ্ডই নয়, পরে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে ফাঁসাতে মামলার গতিপথও প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি তদন্তকারীদের। এ ঘটনায় জেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, গত বছরের ২০ অক্টোবর বাহুবল উপজেলার কাজিহাটা গ্রামে নিজ বাড়ির পাশের একটি বাঁশঝাড় থেকে নাজমা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি জানাজানি হলে পুরো এলাকায় শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে নিহতের মেয়ে নার্গিস আক্তার বাদী হয়ে তার চাচা তোরাব আলীসহ ১০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
তবে তদন্তের একপর্যায়ে এসে পিবিআই জানতে পারে, মামলার আসামি নির্ধারণ থেকে শুরু করে পুরো মামলার বিভিন্ন দিক নিয়ন্ত্রণ করছিলেন আব্দুল গনি। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তোরাব আলী ও তার আত্মীয় সেলিম মিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। এমনকি মারামারির একটি মামলায় জেলও খাটতে হয়েছিল তাকে। সেই ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর পরিকল্পনা করেন বলে ধারণা করছে পিবিআই।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর পাশাপাশি আরেকটি পারিবারিক উদ্দেশ্যও কাজ করেছিল। পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, নিজের বোনকে সতীনের সংসারে আরও শক্ত অবস্থানে রাখার মানসিকতা থেকেও এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়ে থাকতে পারে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই ইন্সপেক্টর রাজিব কুমার দাশ জানান, মামলার ৯ নম্বর আসামি আব্দুন নূরের বিরুদ্ধে তদন্তে কোনো ধরনের অপরাধমূলক সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি। তাকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আব্দুন নূর দাবি করেন, তিনি ঘটনাটি দেখে ফেলেছিলেন বলেই তাকে পরিকল্পিতভাবে মামলার আসামি করা হয়।
এই তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত আরও গভীরভাবে শুরু করে পিবিআই। পরে সন্দেহের তীর গিয়ে পড়ে আব্দুল গনির দিকে। একপর্যায়ে তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়। তবে কিছুদিন কারাগারে থাকার পর মামলার বাদী নার্গিস আক্তারই আদালতের মাধ্যমে তার জামিনের উদ্যোগ নেন।
তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। পিবিআই জানিয়েছে, নিহত নাজমার মেয়ে নার্গিস আক্তারের সঙ্গে আব্দুল গনির ছেলের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরে তাদের বিয়ে হয়। বর্তমানে নার্গিস তার শ্বশুর আব্দুল গনির পক্ষ নিয়ে অবস্থান করছেন এবং তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই অভিযোগ তুলেছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
এ ঘটনায় নিহতের পরিবারে বিভক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে। নিহতের ভাই মনির মিয়া দাবি করেছেন, তার বোনকে হত্যার পর নিরীহ মানুষকে পরিকল্পিতভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে। তিনি সঠিক তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করেন। তার ভাষায়, প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে মামলাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল হান্নান বলেন, এলাকায় এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে কিছু নিরপরাধ ব্যক্তিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
পিবিআই জানিয়েছে, নিহতের সুরতহাল প্রতিবেদনেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নাজমা আক্তারের শরীর ও কাপড় ভেজা ছিল এবং গলায় কাটা দাগ পাওয়া যায়। তদন্তকারীদের ধারণা, হত্যার পর লাশ গোসল করিয়ে আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এসব বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। খুব শিগগিরই আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে। তবে পুরো বিষয়টি নিয়ে এখনো এলাকায় নানা আলোচনা চলছে। কেউ কেউ মনে করছেন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও প্রতিশোধের জটিল সম্পর্কের কারণেই এই হত্যাকাণ্ড রহস্যময় হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পারিবারিক বিরোধ যখন দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তখন অনেক সময় তা ভয়াবহ অপরাধে রূপ নেয়। বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজে সম্পর্কের জটিলতা, জমিজমা, প্রতিশোধ কিংবা সামাজিক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব অনেক বড় ঘটনার জন্ম দেয়। এ ধরনের ঘটনায় সঠিক তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভুলভাবে কাউকে আসামি করা হলে প্রকৃত অপরাধী আড়ালে থেকে যেতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। কেউ তদন্তের অগ্রগতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ পুরো ঘটনাকে রহস্যে ঘেরা বলেও মন্তব্য করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের মামলায় নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
হবিগঞ্জের বাহুবলের এই হত্যাকাণ্ড এখন শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে জটিল সম্পর্ক, প্রতিশোধ ও রহস্যে ঘেরা এক আলোচিত মামলা। তদন্তের শেষ ধাপে এসে যে তথ্যগুলো সামনে আসছে, তা পুরো ঘটনাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে সবাইকে। এখন নজর আদালতের দিকে—শেষ পর্যন্ত এই মামলায় কারা প্রকৃত অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হন এবং বিচার কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।

