প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হচ্ছে আগামী সোমবার থেকে, যা চলবে এক মাসব্যাপী। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও শিশুদের মারাত্মক সংক্রামক রোগ হামের বিস্তার রোধে নেওয়া এই উদ্যোগে সিলেট বিভাগে মোট ৯ লাখ ২৫ হাজার ১৫০ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলা সিভিল সার্জনরা।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এই ক্যাম্পেইনের মূল লক্ষ্য হলো ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে একটি ডোজ এমআর টিকা প্রদান নিশ্চিত করা। পূর্বে টিকা গ্রহণ করলেও কিংবা আগে হাম বা রুবেলা আক্রান্ত হয়ে থাকলেও নির্ধারিত বয়সসীমার সব শিশুকেই এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে এ ধরনের টিকাদান কর্মসূচি রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে এবং শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৪২টি ওয়ার্ডে মোট ৬৮ হাজার ৫৫০ জন শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ে সব শিশুকে টিকাদানের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, নগর এলাকার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে, যাতে কোনো শিশু এই গুরুত্বপূর্ণ টিকার বাইরে না থাকে।
বিভাগের অন্যান্য জেলায়ও বড় পরিসরে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। হবিগঞ্জ জেলায় ৩ লাখ ২৬ হাজার ৪৭৫ জন শিশুকে, সুনামগঞ্জে ৩ লাখ ৪৪ হাজার এবং মৌলভীবাজারে ২ লাখ ১০ হাজার শিশুকে এমআর টিকা প্রদানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি জেলায় স্থায়ী ও অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্র স্থাপন করে কার্যক্রম পরিচালিত হবে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদেরও এই কর্মসূচির আওতায় আনার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার মোট ১ হাজার ৯১৩টি টিকাদান কেন্দ্রের মাধ্যমে এই কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে। এসব কেন্দ্রে শিশুদের নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে টিকা প্রদান নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীরা দায়িত্ব পালন করবেন। জেলার সিভিল সার্জন ডা. রত্মদ্বীপ বিশ্বাস জানান, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন তারা নির্ধারিত সময়ে সন্তানদের টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
তিনি আরও জানান, জেলায় ইতোমধ্যে কয়েকজন শিশুর মধ্যে হাম সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে এবং আরও বেশ কিছু সন্দেহভাজন নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি, তবে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সংক্রমণ প্রতিরোধে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডকে আইসোলেশন ওয়ার্ড হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতেও প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলাতেও টিকাদান কর্মসূচিকে সফল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। জেলার ১২টি উপজেলায় মোট ৩ লাখ ৪৪ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ উপলক্ষে সুনামগঞ্জ ইপিআই ভবনে অনুষ্ঠিত এক অ্যাডভোকেসি সভায় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা অভিভাবকদের সচেতন থাকার আহ্বান জানান। তারা বলেন, এই টিকাদান ক্যাম্পেইন সফল হলে জেলায় হাম-রুবেলার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যাবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও সুরক্ষিত থাকবে।
মৌলভীবাজার জেলায় ২ লাখ ১০ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোঃ মামুনুর রহমান। তিনি জানান, জেলার সব উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থায়ী ও অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যালয় পর্যায়ে শিশুদের টিকাদানের বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা সহজেই এই সেবার আওতায় আসতে পারে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, এই ক্যাম্পেইনের সময় অনলাইন নিবন্ধনের জন্য ইপিআই ভ্যাকসিনেশন অ্যাপ ‘VAXEPI’ ব্যবহার করা যাবে। ১৭ ডিজিটের জন্ম নিবন্ধন নম্বর দিয়ে নিবন্ধন করা সম্ভব হলেও নিবন্ধন ছাড়াও সরাসরি টিকাদান কেন্দ্রে গিয়ে টিকা নেওয়া যাবে। এতে করে প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীও সহজেই সেবার আওতায় আসতে পারবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম ও রুবেলা শিশুদের শ্বাসতন্ত্র ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সময়মতো টিকা গ্রহণ করলে এসব রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। তারা অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় দ্রুত রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে, তাই টিকাদান কর্মসূচিতে সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, টিকাদান কার্যক্রম চলাকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আলাদা টিকাকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা শিশুদের জন্য স্থায়ী ও অস্থায়ী কেন্দ্রগুলোতে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। কোনো কারণে নির্ধারিত কেন্দ্রে টিকা গ্রহণ সম্ভব না হলে নিকটবর্তী যেকোনো কেন্দ্র থেকেই এই সেবা গ্রহণ করা যাবে।
সার্বিকভাবে সিলেট বিভাগের এই বৃহৎ টিকাদান কর্মসূচিকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন, অভিভাবক ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় এই কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে হাম-রুবেলার মতো সংক্রামক রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে এবং শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।


