ঘোড়ার গাড়িতে বিদায়, শিক্ষককে ভালোবাসার শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

মৌলভীবাজারে এক অনন্য ও হৃদয়স্পর্শী আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিদায় জানানো হয়েছে একজন প্রিয় শিক্ষককে। অবসর গ্রহণের ক্ষণটিকে স্মরণীয় করে রাখতে কদমহাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা যে ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছেন, তা শুধু একটি বিদায় অনুষ্ঠান নয়—বরং ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার এক অনুপম উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

সহকারী প্রধান শিক্ষক রানু গোপাল রায়, যিনি দীর্ঘ ৩১ বছর ধরে একই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন, তার বিদায় উপলক্ষে বুধবার দুপুরে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীদের চোখে অশ্রু, সহকর্মীদের কণ্ঠে আবেগ—সব মিলিয়ে মুহূর্তটি হয়ে ওঠে স্মরণীয়। তবে এই বিদায়কে বিশেষ করে তোলে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ—তাকে সুসজ্জিত একটি ঘোড়ার গাড়িতে করে রাজকীয়ভাবে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া।

বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা প্রায় ৬ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে মৌলভীবাজার পৌর শহরের গির্জাপাড়া এলাকায় তার নিজ বাসভবনে গিয়ে শেষ হয়। পুরো পথজুড়ে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। শিক্ষার্থীরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তাদের প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানায়, অনেকেই ফুল ছিটিয়ে শুভকামনা জানান। স্থানীয় মানুষজনও এই ব্যতিক্রমী আয়োজন দেখে মুগ্ধ হন এবং অনেকেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য উপভোগ করেন।

এই আয়োজনের পেছনে ছিল ২০২২ সালের এসএসসি ব্যাচের শিক্ষার্থীদের আন্তরিক উদ্যোগ। তাদের মতে, একজন শিক্ষক হিসেবে নয়, বরং একজন অভিভাবক হিসেবে রানু গোপাল রায় তাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাই তার বিদায়কে সাধারণভাবে নয়, বরং ব্যতিক্রমী ও সম্মানজনকভাবে উদযাপন করতে চেয়েছেন তারা।

বিদ্যালয়ে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রধান শিক্ষক মাহবুবুর রহমান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের প্রশাসক মিজানুর রহমান মিজান। অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের উপস্থিতিতে রানু গোপাল রায়কে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। তার দীর্ঘ কর্মজীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বক্তারা তাকে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে অভিহিত করেন।

সহকর্মী শিক্ষকরা বলেন, রানু গোপাল রায় শুধু একজন দক্ষ শিক্ষকই নন, তিনি ছিলেন নীতিবান, দায়িত্বশীল এবং মানবিক একজন মানুষ। শিক্ষার্থীদের প্রতি তার আন্তরিকতা এবং সহানুভূতি তাকে সবার কাছে প্রিয় করে তুলেছিল। তারা মনে করেন, তার মতো একজন শিক্ষক একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য সম্পদ, যার অভাব সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

শিক্ষার্থীদের অনুভূতিও ছিল একই রকম আবেগপূর্ণ। তারা জানান, যেকোনো সমস্যায় তারা নির্দ্বিধায় তার কাছে যেতে পারতেন। তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই দেননি, বরং জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়েও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাদের কাছে তিনি ছিলেন একজন পরামর্শদাতা, একজন অভিভাবক এবং একজন সত্যিকারের পথপ্রদর্শক। তার বিদায়ে তারা নিজেদের জীবনে একটি শূন্যতা অনুভব করছে বলে জানায়।

এই আয়োজনের সময় অনেক শিক্ষার্থী আবেগ ধরে রাখতে পারেনি। কেউ কেউ কাঁদতে কাঁদতে বিদায় জানায় তাদের প্রিয় শিক্ষককে। আবার কেউ তার হাত ধরে শেষবারের মতো আশীর্বাদ নেয়। পুরো পরিবেশটাই ছিল এক ধরনের মিশ্র অনুভূতির—বিদায়ের বেদনা আর ভালোবাসার উচ্ছ্বাস একসঙ্গে মিলেমিশে এক অনন্য আবহ তৈরি করে।

নিজের বিদায় মুহূর্তে রানু গোপাল রায়ও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, এই বিদ্যালয়ই তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়। এখানকার প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি মানুষ তার জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি সবসময় চেষ্টা করেছেন সততা ও ন্যায়ের পথে থেকে দায়িত্ব পালন করতে। সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া এই ভালোবাসা ও সম্মানই তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি যা কিছু অর্জন করেছেন, তার সবটাই এই বিদ্যালয়ের কারণে সম্ভব হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, নতুন প্রজন্মের শিক্ষকরা এই ধারা বজায় রাখবেন এবং শিক্ষার্থীদের সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।

স্থানীয় অভিভাবকরাও এই আয়োজনের প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে, এমন আয়োজন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে এবং সমাজে শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে। তারা মনে করেন, একজন শিক্ষককে এভাবে সম্মান জানানো শুধু একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ নয়, বরং এটি পুরো সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা।

এই ব্যতিক্রমী বিদায় অনুষ্ঠান মৌলভীবাজারের শিক্ষা অঙ্গনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এটি প্রমাণ করেছে, একজন শিক্ষক শুধু জ্ঞানদাতা নন, তিনি একজন সমাজ নির্মাতা। তার অবদান কখনোই ভোলা যায় না, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও গভীর হয়ে ওঠে।

সবশেষে বলা যায়, ঘোড়ার গাড়িতে করে দেওয়া এই রাজকীয় বিদায় ছিল ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার এক অপূর্ব প্রকাশ। এটি শুধু একটি বিদায় নয়, বরং একজন শিক্ষকের প্রতি তার শিক্ষার্থীদের অমলিন ভালোবাসার স্মারক হয়ে থাকবে দীর্ঘদিন।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

বিএসইসির চেয়ারম্যান ও চার কমিশনারের পদত্যাগ

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

অসময়ে তিন রঙের তরমুজে বাজিমাত কৃষক রিপনের

প্রকাশ:০৪ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

দিরাইয়ে অনলাইন জুয়ার করাল গ্রাস: বিপথগামী যুবসমাজ

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ব্যয় কমিয়ে নতুন দিগন্তের পথে সিলেট-চারখাই-শেওলা মহাসড়ক

প্রকাশ: ৪ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ফাহিমা হত্যার বিচার ১৫ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে: ডা. শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

বিএসইসির চেয়ারম্যান ও চার কমিশনারের পদত্যাগ

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

অসময়ে তিন রঙের তরমুজে বাজিমাত কৃষক রিপনের

প্রকাশ:০৪ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

দিরাইয়ে অনলাইন জুয়ার করাল গ্রাস: বিপথগামী যুবসমাজ

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ব্যয় কমিয়ে নতুন দিগন্তের পথে সিলেট-চারখাই-শেওলা মহাসড়ক

প্রকাশ: ৪ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জাফলং ভ্রমণেই শেষ যাত্রা, নদীতে ডুবে কিশোরের মৃত্যু

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের সতর্কতা

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কালনী নদী এখন প্লাস্টিকের ভাগাড়

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ