প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা এবং মোবাইল ব্যাংকিং সেবার অবাধ ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে দিরাইজুড়ে জেঁকে বসেছে অনলাইন জুয়ার ভয়ংকর নেশা। শান্ত স্নিগ্ধ এই জনপদের অলিগলি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের চায়ের দোকান পর্যন্ত এখন জুয়াড়িদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। কিশোর থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক যুবসমাজের একটি বড় অংশ দ্রুত অর্থ উপার্জনের মরীচিকার পেছনে ছুটে গিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিনোদনের ছদ্মবেশে শুরু হওয়া এই জুয়া খেলা এখন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দিরাই পৌর শহরের ব্যস্ত এলাকাগুলো যেমন উপজেলা রোড, থানা সংলগ্ন সেন মার্কেট, কলেজ রোড এবং হাইস্কুল রোডে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ যখন দৈনন্দিন ব্যস্ততায় মগ্ন, তখন অনেক আড্ডাস্থলে কিংবা মোবাইল রিচার্জের দোকানে এক শ্রেণির তরুণ মোবাইল ফোনের নীল পর্দার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আপাতদৃষ্টিতে তাদের সাধারণ গেমার মনে হলেও মূলত তারা জড়িয়ে পড়ছে ক্রিকেট, ফুটবল, এভিয়েটর গেম কিংবা আইপিএল বেটিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বাজি খেলায়। এমনকি জনপ্রিয় লুডু খেলাও এখন অনলাইন জুয়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। দিনের আলোয় কিংবা গভীর রাতে—সময় যখনই হোক না কেন, অর্থের বিনিময়ে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় চলছে জয়-পরাজয়ের নিষ্ঠুর খেলা।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে জানান, মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের দোকানের ভেতরে কিংবা চায়ের দোকানের আড়ালে বসে খুব সতর্কতার সাথে এসব জুয়ার আসর পরিচালিত হয়। বাইরে থেকে মনে হয় স্বাভাবিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কিন্তু ভেতরটা হয়ে উঠেছে জুয়ার আখড়া। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে তারা বেছে নিয়েছে এমন সব কৌশল, যেখানে বাইরের মানুষের পক্ষে টের পাওয়া প্রায় অসম্ভব। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এই অভিশাপ শুধু পৌর শহরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাজারগুলোতেও এটি ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। গ্রামের সহজ-সরল তরুণেরা যারা এখনো প্রযুক্তির ভালো-মন্দ খুব একটা বুঝে ওঠেনি, তারাও প্রলোভনের শিকার হয়ে এই অন্ধকার পথে পা বাড়াচ্ছে।
অনলাইন জুয়ার এই বিস্তারের পেছনে কাজ করছে দ্রুত বড়লোক হওয়ার এক অবাস্তব স্বপ্ন। বন্ধু বা পরিচিতদের মাধ্যমে প্রথমে সামান্য কিছু টাকার বাজি ধরে খেলা শুরু হলেও, এক পর্যায়ে এটি নেশায় পরিণত হয়। শুরুতে অল্প লাভের মুখ দেখলেও, পরবর্তী পর্যায়ে বড় অঙ্কের টাকা খুইয়ে অনেকে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছেন। টাকা জোগাড় করার তাগিদে অনেকে ধারদেনা করছেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে পরিবারের জমানো টাকা কিংবা গচ্ছিত সম্পত্তি বিক্রি করে বাজি ধরছেন। যখন আর কোনো উপায় থাকে না, তখন নেমে আসে চরম হতাশা। এই হতাশা থেকেই জন্ম নিচ্ছে পারিবারিক কলহ, বিচ্ছেদ এমনকি আত্মহত্যার মতো করুণ পরিণতি।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিভাবক সুমন চৌধুরী অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানান যে, অনেক সচ্ছল পরিবার আজ এই জুয়ার অভিশাপে পথে বসার উপক্রম হয়েছে। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী যারা পড়ালেখায় ভালো ছিল, তারা আজ এই নেশায় বুঁদ হয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে অনেকে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, আবার কেউ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আত্মগোপন করেছেন। তাদের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা বহন করতে গিয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে তাদের পরিবারগুলো। এমন এক অসহায় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন অনেক অভিভাবক, যারা চাইলেও সামাজিক লজ্জায় মুখ খুলতে পারছেন না।
দিরাই সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম তালুকদার এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন যে, তরুণ প্রজন্মের মাঝে প্রযুক্তি আসক্তি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দ্রুত অর্থ উপার্জনের যে শর্টকাট মানসিকতা তৈরি হয়েছে, তা সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি মনে করেন, শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করে এই ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জোরালো ভূমিকা এবং সুস্থ বিনোদনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। অভিভাবক যদি তার সন্তানের মোবাইল ব্যবহারের দিকে নজর না দেন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা না দেয়, তবে প্রশাসনিক অভিযান খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী ফল বয়ে আনবে না।
দিরাই প্রেসক্লাবের সভাপতি মুহাম্মদ আব্দুল বাছির সরদার সামাজিক অস্থিরতার কথা তুলে ধরে বলেন যে, এটি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং একটি সামাজিক মহামারীতে রূপ নিয়েছে। এই জুয়া থেকে টাকা জোগাড় করতে গিয়ে এলাকার অনেক তরুণ এখন চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মারামারি বা সহিংসতার মতো অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। যদিও এই সংক্রান্ত কোনো নির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান নেই, তবুও জনমনে ক্রমবর্ধমান আতঙ্কই বলে দিচ্ছে পরিস্থিতি কতটা নাজুক। অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া মানেই সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়া, যা দিরাইয়ের মতো শান্ত জনপদে কাম্য নয়।
এ বিষয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে দিরাই থানার অফিসার ইনচার্জ এনামুল হক চৌধুরী বলেন যে, অনলাইন জুয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এ ব্যাপারে পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। তিনি স্থানীয় নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যদি কেউ এ ধরনের কার্যক্রমের সাথে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রদান করতে পারেন, তবে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, অনলাইনে গোপনীয়ভাবে এই খেলা চলায় অপরাধীদের চিহ্নিত করা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। তবুও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন।
অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সনজীব সরকার প্রশাসনিক উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে জানান, তরুণ সমাজকে অনলাইন জুয়ার বিষাক্ত ছোবল থেকে বাঁচাতে হলে সচেতনতা সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। তিনি অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন যেন সন্তানেরা কোথায় যাচ্ছে, কাদের সাথে মিশছে এবং ইন্টারনেটে কী করছে, সেদিকে কড়া নজর রাখা হয়। অভিযোগ পাওয়া গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
পরিশেষে বলা যায়, দিরাইয়ের বুকে অনলাইন জুয়ার এই বিস্তার এক গভীর সংকটের সংকেত দিচ্ছে। প্রযুক্তির এই অপব্যবহার যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই প্রজন্মই সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিভাবক এবং সচেতন নাগরিক সমাজ যদি ঐক্যবদ্ধভাবে এই মরণ নেশার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারে, তবে দিরাইয়ের উজ্জ্বল মুখগুলো চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে অনলাইন জুয়ার অন্ধকার গহ্বরে। সময় এসেছে এখনই ব্যবস্থা নেওয়ার, কারণ আগামীর সমৃদ্ধ দিরাই বিনির্মাণে সুস্থ ও অপরাধমুক্ত তরুণ সমাজই আমাদের একমাত্র সম্পদ।


