অসময়ে তিন রঙের তরমুজে বাজিমাত কৃষক রিপনের

প্রকাশ:০৪ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

প্রথাগত কৃষির গণ্ডি পেরিয়ে নতুন কিছু করার স্বপ্ন দেখেছিলেন বাহুবল উপজেলার কচুয়াদি গ্রামের তরুণ কৃষক রিপন মিয়া। সেই স্বপ্ন আজ রূপ নিয়েছে এক অভাবনীয় বাস্তবতায়। সাধারণত গ্রীষ্মকাল তরমুজ উৎপাদনের আদর্শ সময় হলেও, রিপন মিয়া অসময়ে তিন রঙের উন্নত জাতের তরমুজ চাষ করে এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। তার এই কৃষি বিপ্লব কেবল নিজের ভাগ্যের চাকা ঘোরায়নি, বরং আশপাশের কৃষকদের মনে নতুন করে আশার আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা আজ স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে এক উজ্জ্বল নজির হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রিপন মিয়ার স্বপ্নের এই প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, বাড়ির আঙিনায় প্রায় ৩০ শতক জমিতে মাচা পদ্ধতিতে সারি সারি ঝুলছে শত শত তরমুজ। দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন কোনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক অদ্ভুত সুন্দর ক্যানভাস। গাছের লতাগুলোতে ঝুলে থাকা সবুজ, গাঢ় ডোরাকাটা এবং বিচিত্র আকৃতির তরমুজগুলো পথচারীদের দৃষ্টি কাড়ছে প্রতিদিন। শুধু স্থানীয়রাই নন, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন রিপনের এই দৃষ্টিনন্দন তরমুজ ক্ষেত দেখতে। অসময়ে এমন ফলন দেখে অনেকেই যেমন অবাক হচ্ছেন, তেমনি অনেকেই উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন এই আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতিতে নিজেদের যুক্ত করতে।

এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে সিলেট অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকর অংশগ্রহণ এবং রিপন মিয়ার কঠোর পরিশ্রম। কচুয়াদি গ্রামে প্রথমবারের মতো বীজ পাতা কোম্পানির সূর্য ডিম, কিং সুপার এবং রবি জাতের তিন রঙের তরমুজ আবাদ করে তিনি সফল হয়েছেন। শুরুতে গ্রামের অনেকের কাছ থেকে বাঁকা কথা শুনতে হয়েছিল তাকে। অনেকেই বলেছিলেন, অসময়ে এ ধরনের ফসল চাষ করে লোকসানের ঝুঁকি নেওয়ার কোনো মানে হয় না। তবে রিপন দমে যাননি। তিনি উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামিমুল হক শামীমের পরামর্শ গ্রহণ করেন এবং অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে নিজের পরিকল্পনা এগিয়ে নেন।

চাষাবাদের আধুনিক কলাকৌশল হিসেবে রিপন মিয়া ব্যবহার করেছেন মালচিং পেপার প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে জমির মাটির আর্দ্রতা দীর্ঘক্ষণ বজায় থাকে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত আগাছা জন্মানোর সুযোগ পায় না। ফলে গাছের পরিচর্যা অনেক সহজ হয়ে যায় এবং শ্রম ও সেচ খরচ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। এছাড়া পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তিনি পুরো জমিতে জৈব সার এবং জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করেছেন। ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার একেবারেই নিষিদ্ধ করেছিলেন তিনি। পোকামাকড় দমনের জন্য ফেরোমন ফাঁদ ও হলুদ ফাঁদের মতো পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির প্রয়োগ করেছেন, যা নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে এক চমৎকার উদাহরণ।

কৃষক রিপন মিয়ার মতে, প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা ব্যয়ে শুরু করা এই প্রকল্পে তিনি বিষমুক্ত এবং নিরাপদ তরমুজ উৎপাদনকেই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেছিলেন। বর্তমানে প্রতিটি কেজি তরমুজ ৬০ থেকে ৮০ টাকা দরে পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে। তার ক্ষেতে প্রায় ৪০০টি গাছে এক হাজারেরও বেশি তরমুজ ঝুলে আছে। ফলন এবং বর্তমান বাজারমূল্য বিবেচনায় নিলে তিনি এই মৌসুমে দুই লাখ টাকারও বেশি বিক্রির আশা করছেন। খরচ বাদে তার লাভের পরিমাণ যে অংকটা দাঁড়াবে, তা প্রচলিত অন্যান্য ফসলের তুলনায় অনেক বেশি। এই সাফল্যই প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার থাকলে কৃষিকে একটি অত্যন্ত লাভজনক পেশায় রূপান্তর করা সম্ভব।

স্থানীয় কৃষকরা যারা শুরুতে রিপনকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন, এখন তারাই তার ক্ষেতে ভিড় করছেন পরামর্শের জন্য। রিপনের সফলতা তাদের মনে এমন এক আগ্রহ তৈরি করেছে যে, আগামী মৌসুমের প্রস্তুতির জন্য অনেকেই এখন থেকেই মালচিং পেপার ও উন্নত জাতের বীজ সংগ্রহের খোঁজখবর নিচ্ছেন। রিপন মিয়া বলেন, আমি চেয়েছিলাম নতুন কিছু করে দেখাতে। আজ আমার ক্ষেত দেখে যখন মানুষ উৎসাহিত হয়, তখন মনে হয় আমার পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। আমি চাই আমার মতো তরুণরা যেন চাকরির পেছনে না ছুটে আধুনিক কৃষির মাধ্যমে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তোলে।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামিমুল হক শামীম জানান, রিপন মিয়ার মতো উদ্যমী কৃষক কৃষিখাতের সম্পদ। তাকে নিয়মিত কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে এবং মালচিং পেপার, ফেরোমন ফাঁদসহ জৈব সার ব্যবহারের গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সিলেট অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা গেলে বাহুবল উপজেলায় কৃষি বিপ্লব ঘটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন খরচ যেমন কমছে, তেমনি বিষমুক্ত ও নিরাপদ ফসল মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে। রিপনের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই এখন উচ্চমূল্যের ফসল আবাদে ঝুঁকছেন।

প্রান্তিক কৃষকদের উচ্চমূল্যের ফসল চাষে আগ্রহী করে তুলতে এই ধরণের উদ্যোগ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। রিপন মিয়ার এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে যে, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ করলে কৃষি থেকে যেমন অর্থনৈতিক মুক্তি পাওয়া সম্ভব, তেমনি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাও সম্ভব। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই প্রকল্পের সাফল্যের ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের প্রতিটি ঘরে ঘরে এরকম সফলতার গল্প তৈরি হবে। রিপন মিয়া এখন শুধু একজন কৃষক নন, তিনি আধুনিক ও স্মার্ট কৃষির একজন অগ্রদূত, যার হাত ধরে বাহুবল উপজেলার কৃষিব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটেছে। কর্মসংস্থানের সন্ধানে থাকা তরুণদের জন্য রিপন মিয়া এখন একটি জ্বলন্ত অনুপ্রেরণা, যিনি দেখিয়ে দিয়েছেন মাটির মায়ায় লেগে থাকলে মাটিই মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিতে পারে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

হত্যাচেষ্টা মামলায় হাইকোর্টে জামিন পেলেন ব্যারিস্টার সুমন

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | সময়ের সন্ধান ডেস্ক |...

অপহৃত এসএসসি পরীক্ষার্থী উদ্ধার, গ্রেপ্তার অপহরণকারী জয়

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | সময়ের সন্ধান ডেস্ক |...

সুনামগঞ্জে কমছে নদীর পানি, স্বস্তি ফিরছে জনজীবনে

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শ্রীমঙ্গলে ১৮ ফুট অজগর উদ্ধার

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে পুলিশের লুণ্ঠিত টিয়ারগ্যাস গ্রেনেড উদ্ধার

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

অপহৃত এসএসসি পরীক্ষার্থী উদ্ধার, গ্রেপ্তার অপহরণকারী জয়

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | সময়ের সন্ধান ডেস্ক |...

সুনামগঞ্জে কমছে নদীর পানি, স্বস্তি ফিরছে জনজীবনে

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শ্রীমঙ্গলে ১৮ ফুট অজগর উদ্ধার

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে পুলিশের লুণ্ঠিত টিয়ারগ্যাস গ্রেনেড উদ্ধার

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

১৫ বছরের সংসারের ইতি টানলেন ঊর্মিলা-আদীনাথ

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাহজালাল মাজারে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তে প্রশাসন

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

নবীগঞ্জে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মৃত্যু, তদন্তে পুলিশ

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ