প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের শিক্ষা খাতের দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের দাবি আবারও জোরালোভাবে সামনে এসেছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী শিক্ষামন্ত্রীর কাছে সিলেটে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন। তার এই বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে প্রত্যাশা বাড়িয়েছে।
বুধবার দুপুরে সিলেট নগরীর মেন্দিবাগ এলাকায় এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা উপলক্ষে আয়োজিত কেন্দ্র সচিবদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ দাবি উত্থাপন করেন। একই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন, যিনি শিক্ষাখাতের উন্নয়ন নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন এবং সিলেটসহ দেশের সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন।
সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সিলেটের শিক্ষা খাতের বর্তমান বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এখনো সীমিত, বিশেষ করে প্রকৌশল শিক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের অনেকেই ঢাকাসহ অন্যান্য অঞ্চলে যেতে বাধ্য হন, যা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। এই বাস্তবতায় সিলেটে একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান সিলেটে একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। তার মতে, এটি শুধু একটি অসম্পূর্ণ প্রকল্প নয়, বরং সিলেট অঞ্চলের শিক্ষাগত উন্নয়নের একটি হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনা। তিনি শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান, এই উদ্যোগটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে।
শ্রমমন্ত্রী বলেন, সিলেট অঞ্চলের অনেক জনগোষ্ঠী এখনো শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে এই অঞ্চলের তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং তারা প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ পাবে। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
একইসঙ্গে তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন এবং ক্যাম্পাসকে অপরাজনীতি মুক্ত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকা অত্যন্ত জরুরি। এজন্য বিশেষ বরাদ্দ ও কার্যকর নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে।
সিলেটের শিক্ষা খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার দিকও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জেলায় বর্তমানে প্রায় ৮৫০টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে, যা শিক্ষার মানোন্নয়নে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্কুলে ভবন সংকট ও শিক্ষক স্বল্পতা চরম আকার ধারণ করেছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, জেলার প্রায় ৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ভারপ্রাপ্তদের মাধ্যমে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ ও নতুন ভবন নির্মাণের ওপর জোর দেন তিনি।
শিক্ষার অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি কিছু নির্দিষ্ট দাবি-দাওয়াও তুলে ধরেন শ্রমমন্ত্রী। তিনি কোম্পানীগঞ্জে এম সাইফুর রহমান কলেজকে সরকারিকরণের দাবি জানান। পাশাপাশি আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসাগুলোর উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান, যাতে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও আধুনিক শিক্ষার সুযোগ পায়।
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন বলেন, সরকার শিক্ষাখাতে ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে এবং সিলেটের শিক্ষা বিস্তারে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। তিনি জানান, শিক্ষক সংকট নিরসনে দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করা হবে এবং ধাপে ধাপে সব শূন্য পদ পূরণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যেই সরকার জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, দেশের প্রতিটি উপজেলায় মাল্টিপারপাস পরীক্ষা কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। এর ফলে পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমবে এবং একটি সুষ্ঠু পরীক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি অতীতের কিছু সমস্যার কথাও উল্লেখ করেন। তার মতে, বিগত সময়ে শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা ছিল, যার কারণে দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পদ পূরণ করা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমান সরকার এসব জটিলতা দূর করে দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছে।
এছাড়া সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক ছয় লেন প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দ্রুত স্থানান্তর ও নতুন ভবন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এতে করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় উপস্থিত বিভিন্ন শিক্ষাবিদ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতারা সিলেটের শিক্ষা খাত উন্নয়নে একমত পোষণ করেন। তারা মনে করেন, এই অঞ্চলে একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে তা শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়, বরং সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে, সিলেটে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই দাবির প্রেক্ষিতে সরকার কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয় এবং সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের এই প্রত্যাশা কতটা বাস্তবায়িত হয়।


