প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুন। মাধবপুর ইউনিয়নের পাত্রখোলা চা বাগানের পরিত্যক্ত জমিতে গড়ে ওঠা একটি সবজি ক্ষেত মুহূর্তেই ছাই হয়ে গেছে। সেই আগুনে শুধু ফসলই পুড়েনি, পুড়ে গেছে কয়েকজন পরিশ্রমী কৃষকের স্বপ্ন, আশা এবং ভবিষ্যতের ভরসা।
মঙ্গলবার সন্ধ্যার পরপরই অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা পরিকল্পিতভাবে এই আগুন ধরিয়ে দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করে গড়ে তোলা টমেটো ক্ষেতটি রাতের আঁধারে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, যা নিছক দুর্ঘটনা নয় বরং একটি নাশকতামূলক কাজ বলেই তারা মনে করছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে সাদেক মিয়া, চেরাগ মিয়া ও কাজল মিয়া উল্লেখযোগ্য। তারা দীর্ঘদিন ধরে সীমিত সামর্থ্য নিয়েও নতুন কিছু করার স্বপ্ন দেখছিলেন। নিজেদের সামান্য সঞ্চয়, ধার-দেনা এবং আত্মীয়-স্বজনের সহায়তা নিয়ে তারা পাত্রখোলা চা বাগানের পরিত্যক্ত জমিতে টমেটোসহ বিভিন্ন মৌসুমী সবজির চাষ শুরু করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল কৃষির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়া এবং পরিবারকে একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়া।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওই জমিটি আগে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। কৃষকরা উদ্যোগ নিয়ে সেটিকে চাষের উপযোগী করে তোলেন। জমি পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে চারা রোপণ, সেচ ব্যবস্থা, বাঁশের খুঁটি বসানো—সবকিছুতেই তারা নিজেদের শ্রম ও সময় ব্যয় করেন। ধীরে ধীরে ক্ষেতটি সবুজে ভরে ওঠে এবং ফলনের আশায় দিন গুনছিলেন তারা।
কিন্তু হঠাৎ করেই সেই সবুজ ক্ষেত আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আগুনের লেলিহান শিখা যখন ক্ষেতের ওপর ছড়িয়ে পড়ে, তখন অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না কৃষকদের। নিজের হাতে গড়ে তোলা ফসল চোখের সামনে পুড়তে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। সেই দৃশ্য উপস্থিত অনেককেই আবেগাপ্লুত করে তোলে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সাদেক মিয়া জানান, এই প্রকল্পে তারা প্রায় ৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছিলেন। টমেটো চাষের জন্য প্রায় ৭০ হাজার বাঁশের খুঁটি ব্যবহার করা হয়েছিল, যা গাছগুলোকে সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করছিল। এছাড়া ২০টি কীটনাশক স্প্রে মেশিন এবং প্রায় ৬০ বান্ডিল মালচিং পেপার ব্যবহার করা হয়েছিল, যা আগাছা নিয়ন্ত্রণ এবং মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আগুনে এসব মূল্যবান উপকরণ সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, এই অর্থের একটি বড় অংশই ছিল ধার করা। এখন ফসল না থাকায় সেই ঋণ পরিশোধ করা নিয়ে তারা চরম দুশ্চিন্তায় আছেন। ভবিষ্যৎ কী হবে, পরিবার কীভাবে চলবে—এসব প্রশ্নই এখন তাদের সামনে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই ঘটনা শুধু কয়েকজন কৃষকের ক্ষতি নয়, বরং এটি পুরো এলাকার জন্য একটি দুঃখজনক দৃষ্টান্ত। তারা মনে করছেন, পরিকল্পিতভাবে এই আগুন লাগানো হয়েছে এবং এর পেছনে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল থাকতে পারে। তাই দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের শনাক্ত ও শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। প্রাথমিকভাবে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক বা সুনির্দিষ্টভাবে দায়ী করা সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এটি একটি সংবেদনশীল ঘটনা এবং সব দিক বিবেচনা করে তদন্ত চালানো হচ্ছে।
এদিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত রায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। সরকারি প্রণোদনা এবং অন্যান্য সহায়তার মাধ্যমে তাদের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
এই ঘটনার পর কৃষকদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করছে। অনেকেই মনে করছেন, এভাবে যদি পরিশ্রমের ফল ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে কৃষিকাজে আগ্রহ কমে যেতে পারে। বিশেষ করে যারা নতুন করে কৃষিতে বিনিয়োগ করতে চান, তারা নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কৃষি খাতে এমন নাশকতা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে কৃষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।
কমলগঞ্জের এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, কৃষকের ঘাম আর শ্রমের মূল্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একটি ক্ষেত পুড়ে যাওয়া মানে শুধু কিছু ফসলের ক্ষতি নয়, বরং তা একটি পরিবারের স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং ভবিষ্যতের ভরসা ধ্বংস হয়ে যাওয়া। এখন সবার চোখ প্রশাসনের দিকে—কবে দোষীরা ধরা পড়বে এবং কবে এই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা তাদের হারানো স্বপ্ন ফিরে পাওয়ার পথে এগোতে পারবেন।


