প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জ শহরের ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় গভীর রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত আটটি দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনের লেলিহান শিখায় মুহূর্তেই গ্রাস হয়ে যায় ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো, আর চোখের সামনে জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন ব্যবসায়ীরা। প্রাথমিকভাবে কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে, যদিও সঠিক হিসাব নিরূপণে সময় লাগবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
রোববার রাত প্রায় ১১টার দিকে শহরের ট্রাফিক পয়েন্ট এলাকায় হঠাৎ করে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিটি ফার্মেসি সংলগ্ন পপুলার ইলেকট্রনিক্স নামের একটি দোকান থেকে আগুনের শুরু হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন আশপাশের দোকানগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে এবং দ্রুত ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সিটি ফার্মেসি, বিক্রমপুর শো স্টোর, বেবি শোজ, আজাদ শোজ এবং প্রমাণ শোজসহ আশপাশের আরও কয়েকটি দোকানে। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে আগুনের তীব্রতা পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। স্থানীয় বাসিন্দারা ছুটে এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেও আগুনের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। তবে আগুনের ব্যাপকতা এবং দোকানগুলোতে থাকা দাহ্য পদার্থের কারণে আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয় তাদের। দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টা চালিয়েও আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিলম্ব হয়, ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।
এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। বিক্রমপুর শো স্টোরের মালিক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, তিনি দোকান বন্ধ করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পর খবর পান আগুন লাগার। ঘটনাস্থলে এসে দেখেন, তার দোকানসহ আশপাশের অন্তত সাতটি দোকান আগুনে পুড়ে যাচ্ছে। তার ভাষায়, “আমার প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে গেছে। কীভাবে আগুন লাগল, কিছুই বুঝতে পারছি না। এখন আমরা কোথায় দাঁড়াবো, সেটাই ভাবছি।”
একইভাবে পপুলার ইলেকট্রনিক্সের মালিক পারভেজ আহমদও গভীর ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, দোকান বন্ধ করে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুনের খবর পান। ফিরে এসে দেখেন তার দোকান সম্পূর্ণভাবে আগুনে পুড়ে যাচ্ছে। তার মতে, প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে, যা তার পক্ষে কোনোভাবেই পোষানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “এই ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি আমাদের জীবনের স্বপ্ন ধ্বংস করে দিয়েছে।”
সুনামগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রতন শেখ জানান, আগুনে অন্তত ছয় থেকে সাতটি দোকানঘর সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং আশপাশের আরও কয়েকটি দোকান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, “এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকার বেশি হতে পারে। আগুনের কারণ অনুসন্ধানে আমরা কাজ করছি।”
স্থানীয়দের দাবি, ওই এলাকায় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না এবং দোকানগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের অভাব ছিল। ফলে আগুন লাগার পর তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। তারা আরও বলেন, বিদ্যুৎ লাইনের ত্রুটি বা শর্ট সার্কিট থেকেও আগুনের সূত্রপাত হতে পারে, যদিও এটি এখনো নিশ্চিত নয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের বিভিন্ন শহরে গড়ে ওঠা অপরিকল্পিত মার্কেটগুলোতে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ছোট ছোট দোকানে দাহ্য পণ্য মজুদ থাকলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যায়।
এই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং পর্যাপ্ত সরঞ্জাম থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা হলেও কমানো যেত।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন। তাদের দাবি, এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই। তাই দ্রুত পুনর্বাসন এবং আর্থিক সহায়তা না পেলে তারা চরম দুর্ভোগে পড়বেন।
সব মিলিয়ে, সুনামগঞ্জের এই অগ্নিকাণ্ড শুধু কয়েকটি দোকান পুড়ে যাওয়ার ঘটনা নয়, বরং এটি বহু পরিবারের জীবিকা ও স্বপ্ন ধ্বংসের প্রতিচ্ছবি। এখন প্রয়োজন দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে আগুনের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।


