প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগে আবারও সংক্রামক রোগ ‘হাম’ উদ্বেগজনক হারে বাড়তে শুরু করেছে। সাধারণত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও এবার তরুণদের মধ্যেও সংক্রমণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, নতুন শনাক্তের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে বিশেষ আইসোলেশন সেন্টার চালু করা হয়েছে, যেখানে আক্রান্তদের পৃথকভাবে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি হিসেব অনুযায়ী, গত রোববার পর্যন্ত সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম রোগের লক্ষণ নিয়ে অন্তত ২০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে নমুনা পরীক্ষায় আরও চারজনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। ফলে মোট আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। আক্রান্তদের মধ্যে বেশিরভাগই শিশু, তবে প্রাপ্তবয়স্কদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা সংক্রমণের বিস্তারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম জানান, বর্তমানে ভর্তি রোগীদের মধ্যে ১৬ জন সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া মৌলভীবাজারের ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে দুজন এবং সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুজন রোগী ভর্তি আছেন। আক্রান্তদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
নতুন শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে তিনজন হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট, বাহুবল ও মাধবপুর উপজেলা থেকে এবং একজন সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা থেকে শনাক্ত হয়েছেন। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, সংক্রমণ শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়, বরং জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ছে। এতে করে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে গত বৃহস্পতিবার বিশেষ আইসোলেশন সেন্টার চালু করা হয়। বর্তমানে সেখানে ১৬ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে আক্রান্তদের আলাদা করে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে অন্য রোগীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে। আইসোলেশন সেন্টার চালুর ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কিছুটা স্বস্তি এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মিজানুর রহমান জানান, ভর্তি রোগীদের মধ্যে ১৪ জনই শিশু এবং দুজন প্রাপ্তবয়স্ক। শিশুদের মধ্যে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকায় তাদের চিকিৎসায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, আক্রান্তদের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে এবং রিপোর্ট পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে দুই শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক, যা পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে যদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যথাযথভাবে গ্রহণ না করা হয়। বিশেষ করে যেসব শিশু নিয়মিত টিকা পায়নি, তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।
তবে সিলেটে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে নমুনা পরীক্ষার অভাব। বর্তমানে এই বিভাগে হামের নমুনা পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে রোগ নির্ণয়ের জন্য পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে রাজধানী ঢাকার ওপর। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নমুনা পাঠানো হয় মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে, যেখানে একমাত্র ল্যাবে হামের পরীক্ষা করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ফলাফল পেতে অন্তত সাত দিন সময় লাগে, যা চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বিলম্ব সৃষ্টি করে।
এ বিষয়ে সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন জানান, রোগীর শরীরে হামের নির্দিষ্ট লক্ষণ দেখা দিলে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়। রিপোর্ট আসা পর্যন্ত রোগীদের আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। তিনি বলেন, সংক্রমণ যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
স্থানীয়ভাবে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বর, গায়ে ফুসকুড়ি, চোখ লাল হওয়া এবং কাশি—এই উপসর্গ নিয়ে অনেক রোগী হাসপাতালে আসছেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রথমে সাধারণ জ্বর ভেবে চিকিৎসা নেওয়া হলেও পরে তা হাম হিসেবে শনাক্ত হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, করোনা মহামারির সময় অনেক শিশুর নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছিল। এর ফলে অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে, যা এখন হামসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগের বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। তাই দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে, অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে যেসব শিশু ছোট এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের নিয়ে পরিবারগুলো বেশি চিন্তিত। অনেকেই হাসপাতালে ভিড় করছেন, আবার কেউ কেউ প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা না নিয়ে পরিস্থিতি জটিল করে ফেলছেন।
সিলেটের এই পরিস্থিতি স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং তা বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, সিলেটে হাম রোগের এই বাড়তি প্রাদুর্ভাব শুধু একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং এটি জাতীয় পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য ইস্যুতে পরিণত হতে পারে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব, অন্যথায় এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।


