প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ফুটবল বিধাতা যেন আজ চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন হার্ড রক স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায়। মায়ামি গার্ডেন্সে বাংলাদেশ সময় শনিবার সকালে শেষ হওয়া এক রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ৩-২ গোলে পরাজিত করেছে দুর্দান্ত লড়াকু দল কেপ ভার্ডেকে। একশো বিশ মিনিটের এই মহাকাব্যিক লড়াই কেবল গোল কিংবা জয়-পরাজয়ের হিসেব নয়, বরং এটি ছিল এক অসম সাহসী ক্ষুদ্র এক দেশের ফুটবলীয় রূপকথার সমাপ্তি এবং বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের টিকে থাকার লড়াই। মেসি-মার্তিনেসদের আর্জেন্টিনা এদিন বারংবার প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙেছে, আবার নিজেদের ভুলে খেসারত দিয়ে সমতায় ফিরেছে। শেষ পর্যন্ত একটি আত্মঘাতী গোল শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখল লিওনেল স্কালোনির শিষ্যদের।
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা বল দখলের লড়াইয়ে আধিপত্য দেখালেও কেপ ভার্ডের রক্ষণভাগ ছিল যেন দুর্ভেদ্য প্রাচীর। বল পজিশন নিয়ে ৬০ শতাংশের বেশি সময় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখলেও প্রথমার্ধে লিওনেল মেসিদের খেলা ছিল কিছুটা ধীরগতির এবং ছকবাঁধা। আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচে ২২টি শট নিয়েছে, যার মধ্যে ১০টিই ছিল লক্ষ্যভেদী। বিপরীতে, কেপ ভার্ডের সাহসী ফুটবলাররা তাদের ১৬টি শটের মধ্যে ৫টি লক্ষ্যে রেখে বারবারই আর্জেন্টাইন রক্ষণভাগকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। প্রথমার্ধের দীর্ঘ সময় দুই দলের আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের ডামাডোলে গোলশূন্য স্কোরলাইন যখন বিরক্তিকর হয়ে উঠছিল, তখনই ত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হন লিওনেল মেসি।
বিরতির ঠিক আগে লিসান্দ্রো মার্তিনেসের একটি উঁচু থ্রু বল দারুণ দক্ষতায় নিয়ন্ত্রণে নেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। ডি-বক্সের ভেতর এক চিমটি জাদু মিশিয়ে দুরূহ কোণ থেকে বাঁ পায়ের শটে তিনি যখন গোলরক্ষককে পরাস্ত করলেন, তখন গ্যালারিতে নেমে এলো বাঁধভাঙা উল্লাস। এই গোলের মাধ্যমে চলতি বিশ্বকাপে নিজের সপ্তম গোলটি পূর্ণ করলেন মেসি। সেই সঙ্গে বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা ২০-এ পৌঁছাল, আর জাতীয় দলের জার্সিতে ২০৩ ম্যাচে তার গোল এখন ১২৪টি। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে এককভাবে শীর্ষে উঠে এলেন তিনি। মনে হচ্ছিল, প্রথমার্ধের এই লিডই আর্জেন্টিনাকে জয়ের পথে এগিয়ে নেবে, কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই কেপ ভার্ডের খেলায় এক নতুন তেজ লক্ষ্য করা গেল। প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে আসা এই আফ্রিকান দেশটির ফুটবলাররা প্রমাণ করলেন, তারা কেবল অংশ নিতে আসেননি, ইতিহাস গড়তেই এসেছেন। ৫৪তম মিনিটে দুয়ার্তের নিচু শট এমিলিয়ানো মার্তিনেস রুখে দিলেও, পাঁচ মিনিট পরই তারা স্তব্ধ করে দেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের। রায়ান মেন্দেসের পাস থেকে নিখুঁত শটে গোল করে কেপ ভার্ডকে সমতায় ফেরান দেরয় দুয়ার্তে। এই গোলের পর আর্জেন্টাইন শিবিরে যেন কিছুটা মরিয়া ভাব চলে আসে। মেসিকে ফাউল করে দুয়ার্তে হলুদ কার্ড দেখার পর উত্তেজনার পারদ বাড়তে থাকে। ৮১তম মিনিটে নাহুয়েল মোলিনার পাসে এন্সো ফের্নান্দেসের শট কোনোমতে গোললাইন থেকে রক্ষা করেন পিকো লোপেস, যা কেবল ভাগ্য জোরেই গোল হয়নি।
নির্ধারিত সময়ের শেষের দিকে পেনাল্টির জোরাল আবেদন জানায় আর্জেন্টিনা। ডি-বক্সে আলেক্সিস মাক আলিস্তেরের হেডে বল পিকো লোপেসের হাতে লাগলে রেফারির বাঁশি নীরবই ছিল। আট মিনিটের অতিরিক্ত সময়েও মেসি তার জাদুকরী ফ্রি কিক দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কেপ ভার্ডের গোলরক্ষক ভজিনিয়া দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। খেলা গড়াল অতিরিক্ত সময়ে। সেখানেও নাটকীয়তা যেন থামার নাম নিল না। অতিরিক্ত সময়ের একদম শুরুতে মেসির কর্নার থেকে পাওয়া বলে লিসান্দ্রো মার্তিনেস লক্ষ্যভেদ করলে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। লিসান্দ্রোর জাতীয় দলের ক্যারিয়ারে এটি ছিল মাত্র দ্বিতীয় গোল, যা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এসে এক বিশাল স্বস্তি বয়ে আনে।
কিন্তু কেপ ভার্ড যে পরাজয় মেনে নেওয়ার পাত্র নয়, তা প্রমাণিত হলো ১০২তম মিনিটে। অসাধারণ এক ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে লোপেস কাবরাল গোল করে আবারও সমতায় ফিরিয়ে আনেন তার দলকে। পুরো স্টেডিয়াম তখন স্তব্ধ। দুইবার পিছিয়ে পড়ার পরও যেভাবে দলটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসে একটি নজির হয়ে থাকবে। তবে নিয়তির লিখন হয়তো ছিল ভিন্ন। ১১১তম মিনিটে মেসির কর্নার কিক থেকে আসা বলে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর হেড ডিনে বর্জেসের হাতে লেগে জালে জড়িয়ে যায়। গোলরক্ষক ভজিনিয়ার ঝাঁপিয়ে পড়ার পরও বলের দিক পরিবর্তনের কোনো সুযোগ ছিল না। দুর্ভাগ্যজনক এই আত্মঘাতী গোলটিই নির্ধারণ করে দেয় ম্যাচের ভাগ্য। শেষ মুহূর্তগুলোতে সিডনি কাবরালের একটি দারুণ ফ্রি কিক এমিলিয়ানো মার্তিনেস কোনোমতে প্রতিহত করলে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টিনা।
আগামী মঙ্গলবার আটলান্টায় মিশরের বিপক্ষে কোয়ার্টার-ফাইনালের কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। তবে এই ম্যাচে হারলেও কেপ ভার্ড জয় করেছে বিশ্বজুড়ে অগণিত ফুটবল প্রেমীর হৃদয়। মাত্র ছয় লাখ জনসংখ্যার দেশটি স্পেন এবং উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলকে রুখে দিয়ে যেভাবে এই আসরে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, তা ফুটবল রূপকথায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তারা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে, দৃঢ় সংকল্প এবং সাহসের সামনে বড় বড় ফুটবল শক্তিও নুয়ে পড়তে বাধ্য। আজকের এই জয় আর্জেন্টিনাকে শিরোপার আরও এক ধাপ কাছাকাছি নিয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু মাঠের ফুটবলে কেপ ভার্ড যে লড়াইয়ের পরিচয় দিয়েছে, তা বিশ্ব ফুটবলের জন্য একটি বড় প্রাপ্তি। আর্জেন্টিনা শিবির স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে ঠিকই, কিন্তু পরের রাউন্ডে আরও সতর্ক না হলে এই কঠিন পথ পাড়ি দেওয়া সহজ হবে না। দলের রক্ষণভাগের সমন্বয় এবং মাঝমাঠের গতি আরও বাড়ানো এখন স্কালোনির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে মেসির পায়ে বল থাকলে যেকোনো অসম্ভবকেই সম্ভব করা যায়, এই বিশ্বাস নিয়ে কোটি ভক্ত এখন তাকিয়ে আছে কোয়ার্টার-ফাইনালের সেই লড়াইয়ের দিকে।


