প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন
সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোগলাবাজার থানাধীন একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এক ছাত্রীকে উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় এক মাস নিখোঁজ থাকার পর র্যাবের অভিযানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার চর ইসলামপুর এলাকা থেকে ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করা হয়। একই অভিযানে অপহরণের অভিযোগে তার গৃহশিক্ষক অন্তর খাঁনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, ছাত্রীকে প্রেমের সম্পর্কের প্রলোভন দেখিয়ে বাড়ি থেকে দূরে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। তবে মামলাটি বিচারাধীন হওয়ায় অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই হবে নির্ধারক।
র্যাব ও স্থানীয় পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া শিক্ষার্থী দক্ষিণ সুরমার মোগলাবাজার এলাকার একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী। গত ২১ মে সকালে সে প্রতিদিনের মতো স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়। কিন্তু দিনের নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও বাড়িতে ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন এবং সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে মোগলাবাজার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সূত্রে জানতে পারেন, ছাত্রীর গৃহশিক্ষক অন্তর খাঁনের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। পরিবারের অভিযোগ, সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি ছাত্রীকে প্রেমের সম্পর্কের প্রলোভন দেখান এবং একপর্যায়ে স্থানীয় কলাবাগান বাজার এলাকা থেকে তাকে জোরপূর্বক নিয়ে গিয়ে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখেন। এ অভিযোগের ভিত্তিতে ছাত্রীর মা বাদী হয়ে মোগলাবাজার থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলার তদন্ত শুরু হওয়ার পর পুলিশ ও র্যাব পৃথকভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালায়। প্রযুক্তিগত তথ্য, গোয়েন্দা নজরদারি এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে র্যাব অভিযুক্তের সম্ভাব্য অবস্থান শনাক্ত করে। এরপর বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার চর ইসলামপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে নিখোঁজ ছাত্রীকে উদ্ধার করা হয় এবং অন্তর খাঁনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
র্যাব জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া অন্তর খাঁনের বয়স ২৫ বছর। তিনি হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার এড়ালিয়া পাড়ার বাসিন্দা এবং আজাদ খাঁনের ছেলে। শুক্রবার, ১৯ জুন দুপুরে তাকে মোগলাবাজার থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে পুলিশ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের হওয়া মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে। আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া শিক্ষার্থীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তার জবানবন্দি গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং ঘটনার প্রকৃত পটভূমি উদঘাটনে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত কোনো ব্যক্তি যদি বিশ্বাসের অপব্যবহার করেন, তবে তা শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, তাদের মানসিক পরিবর্তনের প্রতি অভিভাবকদের নজর এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গৃহশিক্ষক বা ব্যক্তিগত শিক্ষকের বিষয়ে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই এবং নিয়মিত তদারকিও গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত সময়ের মধ্যে ছাত্রীকে উদ্ধারে র্যাব ও পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করলেও, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আরও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। অভিভাবকরাও সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত এখনো চলমান। উদ্ধার হওয়া শিক্ষার্থীর জবানবন্দি, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র উদঘাটনের চেষ্টা করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি, মামলার সব বিষয় আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে তাকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যায় না। তাই এই ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তা অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে।


