প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলায় এক কলেজছাত্রীকে উত্ত্যক্ত ও ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বিক্ষোভে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভ কর্মসূচির একপর্যায়ে মহাসড়ক অবরোধ করা হলে প্রায় এক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে সড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় এবং দুর্ভোগে পড়েন শত শত যাত্রী।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দুপুরে উপজেলার আউশকান্দি রশিদিয়া পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের সামনে থেকে ‘ছাত্র-ছাত্রী ও সচেতন এলাকাবাসী’ ব্যানারে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি এতে অংশ নেন অভিভাবক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। মিছিলটি আউশকান্দি হীরাগঞ্জ বাজারের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আউশকান্দি কিবরিয়া চত্বরে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়।
সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, স্থানীয়ভাবে পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে এক কলেজছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করে আসছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে ওই ছাত্রীকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত গণবিক্ষোভে রূপ নেয়।
বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, স্থানীয় ছাত্রদল কর্মী হিসেবে পরিচিত শাকিল আহমেদ এবং তার সহযোগী শাহিন তালুকদার এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তবে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ন্যস্ত রয়েছে। ফলে অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সমাবেশ শেষে শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ কর্মসূচি শুরু করেন। এতে দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই মহাসড়কে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, ব্যক্তিগত যানবাহনসহ বিভিন্ন পরিবহনের দীর্ঘ সারি সৃষ্টি হয়। অনেক যাত্রীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কেউ কেউ বিকল্প সড়ক ব্যবহারের চেষ্টা করলেও অধিকাংশ যাত্রী দুর্ভোগের মধ্যে পড়ে যান।
অবরোধে অংশ নেওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এ ধরনের অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তারা দাবি করেন, প্রভাবশালী পরিচয়ের কারণে যেন কোনো অভিযুক্ত আইনের বাইরে থাকার সুযোগ না পায়। দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা কমে আসবে বলেও তারা মনে করেন।
স্থানীয় বাসিন্দারাও শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। তাদের ভাষ্য, এলাকায় নারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। কোনো তরুণী বা শিক্ষার্থী যদি দীর্ঘদিন ধরে হয়রানির শিকার হন এবং তার অভিযোগ যথাসময়ে গুরুত্ব না পায়, তাহলে সমাজে নেতিবাচক বার্তা যায়। তাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দ্রুত ও নিরপেক্ষ ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি বলে তারা মনে করেন।
পরিস্থিতির খবর পেয়ে নবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোনায়েম মিয়া ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন।
পুলিশের আশ্বাসের পর আন্দোলনকারীরা অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন। এরপর ধীরে ধীরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে। তবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন, আবার কেউ কেউ অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নারী ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা সহিংসতার অভিযোগ দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা জরুরি। এতে একদিকে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচারের আশা পান, অন্যদিকে গুজব ও সামাজিক অস্থিরতা কমে আসে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থাও বৃদ্ধি পায়।
নবীগঞ্জের এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, নারীর নিরাপত্তা কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি সামগ্রিক সামাজিক দায়িত্বের বিষয়। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, অপরাধ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তি এবং আইনগত প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাবই পারে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন এলাকাবাসী।


