প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন
মৌলভীবাজারের বড়লেখায় আলোচিত জোড়া হত্যা মামলার এক এজাহারভুক্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে থাকা সামছুল ইসলাম (৩৮) নামের ওই আসামিকে রোববার রাতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে আটক করা হয়। সোমবার তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গত বছরের শেষ দিকে সংঘটিত দুই ভাই হত্যার ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সেই মামলার অন্যতম আসামির গ্রেপ্তারকে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া সামছুল ইসলাম বড়লেখা উপজেলার বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম) এলাকার বাসিন্দা। তিনি মৃত আব্দুস ছবুরের ছেলে। তার বিরুদ্ধে বড়লেখা থানায় দায়ের করা চাঞ্চল্যকর দুই ভাই হত্যা মামলায় সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। মামলায় নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকেই তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে ছিলেন বলে জানা গেছে।
মামলার নথি ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর বড়লেখা উপজেলার বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম) গ্রামে পূর্ব বিরোধকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, ওই বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের লোকজন সংঘবদ্ধ হয়ে আব্দুল কাইয়ুম ও তার ভাই জামাল উদ্দিনের ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র, লাঠিসোটা ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করে তাদের ওপর এলোপাতাড়ি আঘাত করে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে দুই ভাই গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করলেও আঘাতের তীব্রতায় ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়। একসঙ্গে দুই ভাইয়ের মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে এবং ঘটনার বিচার দাবিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এই হত্যাকাণ্ডের পর নিহতদের পরিবার আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ঘটনার দুই দিন পর, অর্থাৎ ২৯ ডিসেম্বর নিহত এক ভাইয়ের স্ত্রী হালিমা বেগম বাদী হয়ে বড়লেখা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মামলাটি দায়েরের পর থেকেই পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করে আসছে।
স্থানীয়দের মতে, দুই ভাই হত্যার ঘটনাটি শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়, বরং দীর্ঘদিনের বিরোধ কীভাবে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পরিণত হতে পারে তার একটি দৃষ্টান্ত। গ্রামে এ ঘটনার পর বেশ কিছুদিন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করেছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বাড়তি নজরদারি চালানো হয়।
বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান খান জানিয়েছেন, মামলার এজাহারভুক্ত আসামি সামছুল ইসলামকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি বলেন, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং জড়িত অন্য আসামিদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয় এবং আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ, হামলার পরিকল্পনা এবং অভিযুক্তদের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান করা হচ্ছে। মামলার বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের কাজ চলছে।
এদিকে নিহতদের স্বজনরা এই গ্রেপ্তারকে স্বাগত জানালেও তারা মামলার সব আসামিকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, ঘটনার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন এখনও পলাতক রয়েছেন। ফলে মামলার পূর্ণাঙ্গ বিচার নিশ্চিত করতে সবাইকে গ্রেপ্তার করা জরুরি। তারা আশা করছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান তৎপরতার মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীরা বিচারের মুখোমুখি হবে।
মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের জোড়া হত্যার ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি পরিবারের দুই সদস্যকে হারানোর বেদনা শুধু ওই পরিবার নয়, পুরো সমাজকেও নাড়া দেয়। তাই বিচারিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং প্রমাণভিত্তিক তদন্ত নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সমাজসেবীরা বলছেন, গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘদিনের বিরোধ অনেক সময় সহিংস রূপ নেয়। এসব বিরোধ শুরুতেই সামাজিক ও আইনি উপায়ে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া গেলে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব। তারা স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং সামাজিক সম্প্রীতি জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
দুই ভাইকে হারানোর পর নিহতদের পরিবার এখনও শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যদের হারিয়ে তারা আর্থিক ও মানসিকভাবে কঠিন সময় পার করছেন। তাদের প্রত্যাশা, আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত হবে এবং ভবিষ্যতে কেউ যেন এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।
বড়লেখার আলোচিত এই জোড়া হত্যা মামলায় সামছুল ইসলামের গ্রেপ্তার তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে মামলার পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি এবং প্রকৃত বিচার নিশ্চিত করতে এখনও অনেক পথ বাকি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং তদন্ত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। এলাকার মানুষও এখন তাকিয়ে আছেন বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে, যাতে দুই ভাই হত্যার ঘটনায় দায়ীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত হয়।


