প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন
সিলেট মহানগর এলাকায় চোরাচালানবিরোধী অভিযানে বালুভর্তি একটি ট্রাকের নিচে লুকিয়ে রাখা বিপুল পরিমাণ ভারতীয় জিরা উদ্ধার করেছে পুলিশ। অভিনব কৌশলে বালুর স্তরের নিচে গোপন রাখা প্রায় ২ হাজার ২৫০ কেজি জিরা জব্দের ঘটনায় একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত জিরার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঘটনাটি সিলেট নগরীতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলে চোরাচালান চক্রের নতুন কৌশল নিয়ে উদ্বেগও বাড়িয়েছে।
সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) জালালাবাদ থানা সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রবিবার (৭ জুন) বিকেলে শিবেরবাজার এলাকার বটেরতল পয়েন্টে একটি বিশেষ চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়। ওই সময় সন্দেহভাজন একটি বালুবাহী ট্রাককে থামিয়ে তল্লাশি শুরু করে পুলিশ। প্রথম দৃষ্টিতে ট্রাকটি সাধারণ বালুবাহী যানবাহন মনে হলেও পুলিশের সন্দেহের কারণে বিস্তারিত অনুসন্ধান চালানো হয়।
তল্লাশির একপর্যায়ে ট্রাকের উপরের বালুর স্তর সরিয়ে দেখা যায়, নিচে কৌশলে লুকিয়ে রাখা হয়েছে বিপুল পরিমাণ জিরার বস্তা। পরে একে একে মোট ৭৫টি বস্তা উদ্ধার করা হয়। প্রতিটি বস্তায় ভারতীয় জিরা সংরক্ষিত ছিল বলে নিশ্চিত করে পুলিশ। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী উদ্ধার হওয়া জিরার মোট ওজন প্রায় ২ হাজার ২৫০ কেজি।
অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা জানান, চোরাচালানকারীরা প্রায়ই বিভিন্ন বৈধ পণ্যের আড়ালে অবৈধভাবে বিদেশি পণ্য পরিবহনের চেষ্টা করে থাকে। তবে বালুর নিচে এত বিপুল পরিমাণ মসলা লুকিয়ে পরিবহনের ঘটনা বেশ ব্যতিক্রমী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, সীমান্ত এলাকা থেকে এসব পণ্য দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সাদিকুর রহমান (৩২) নামের এক যুবককে আটক করা হয়। তিনি জালালাবাদ থানার নলকট গ্রামের মৃত মছদ্দর আলীর ছেলে। জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রাথমিক তদন্ত শেষে তাকে বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। সোমবার (৮ জুন) আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
সোমবার দুপুরে সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মনজুরুল আলম সাংবাদিকদের জানান, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে এই সাফল্য এসেছে। তিনি বলেন, ট্রাকটির ভেতরে থাকা বালুর নিচে চোরাই পণ্য লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, যাতে সাধারণ তল্লাশিতে তা ধরা না পড়ে। তবে পুলিশের সতর্কতা ও পেশাদার তৎপরতার কারণে পুরো চালানটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় জালালাবাদ থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির পাশাপাশি পলাতক ও অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে পুরো চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে এই চালানের সঙ্গে আর কারা জড়িত ছিল, কোথা থেকে পণ্য আনা হয়েছিল এবং কোথায় নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল—সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সিলেট সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের চোরাচালান কার্যক্রমের ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে ভারত থেকে বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য, মসলা, প্রসাধনী, কাপড় ও অন্যান্য পণ্য অবৈধভাবে দেশে আনার চেষ্টা প্রায়ই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে। এসব কর্মকাণ্ড শুধু সরকারের রাজস্ব ক্ষতির কারণ নয়, বরং বৈধ ব্যবসায়ীদের জন্যও বড় ধরনের প্রতিযোগিতামূলক সংকট তৈরি করে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়িক মহলের মতে, চোরাইপণ্য বাজারে প্রবেশ করলে বৈধ আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। সরকারও শুল্ক ও কর থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে চোরাচালান প্রতিরোধ শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
স্থানীয়দের অনেকে মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় একের পর এক চোরাচালান চালান জব্দ হচ্ছে। তবে শুধু বাহক বা পরিবহনকারীদের গ্রেফতার করলেই হবে না, বরং এর পেছনে থাকা মূল হোতাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। তাহলেই এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্ত এলাকা ও অভ্যন্তরীণ সড়কপথে নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে সন্দেহজনক পণ্যবাহী যানবাহনের ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং নিয়মিত চেকপোস্ট কার্যক্রমের মাধ্যমে চোরাচালান প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সিলেট মহানগর পুলিশের দাবি, এই অভিযান শুধু একটি অবৈধ চালান জব্দের ঘটনা নয়; এটি বৃহত্তর চোরাচালান নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ। উদ্ধার হওয়া জিরার উৎস, পরিবহন রুট এবং সম্ভাব্য গন্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে ভবিষ্যতে আরও গ্রেফতার হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে পুলিশ।
বালুর স্তরের নিচে বিপুল পরিমাণ জিরা লুকিয়ে পরিবহনের এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে চোরাচালানকারীরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তা এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড আগের তুলনায় বেশি শনাক্ত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, ধারাবাহিক অভিযান ও কঠোর আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে সীমান্তভিত্তিক চোরাচালান কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, চোরাচালান চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে এবং আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


