প্রকাশ:২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলার সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধ দমন এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশ কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। অপরাধের মূলোৎপাটন ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনায় সারা দেশব্যাপী এক সাঁড়াশি বিশেষ অভিযান এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গত প্রায় তিন মাসের একটানা এই জোরালো কার্যক্রমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৮৯ জন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় এবং অপরাধের শিকড় আলগা করতে পুলিশের এই ব্যাপক ভূমিকা জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে শুরু করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক অফিসিয়াল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চলতি বছরের গত ১ মে থেকে শুরু করে ২৭ জুলাই পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও মেট্রোপলিটন এলাকায় এই বহুমুখী অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করা হয়েছে। সাধারণ জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে পুলিশ প্রশাসনের এই নিরলস প্রচেষ্টা সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে। অপরাধের বহুমুখী উৎস বন্ধ করতে এবং অপরাধচক্রের মূল হোতাদের পাকড়াও করতে পুলিশ মাঠপর্যায়ে অত্যন্ত পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।
গত প্রায় তিন মাসের এই দীর্ঘ ও সমন্বিত অভিযানে দুই ভাগে মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৮৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু অপরাধ ও অপরাধীচক্রকে লক্ষ্য করে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩৯ হাজার ২৬৭ জন। অন্যদিকে, বিভিন্ন থানায় দায়ের করা নিয়মিত মামলা এবং নিয়মিত আইন প্রয়োগকারী অভিযানের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৭২২ জন অপরাধীকে। দেশের অপরাধের গ্রাফ নিম্নমুখী করতে পুলিশের এই সাঁড়াশি অভিযান মাঠপর্যায়ে দারুণ প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অপরাধীরা যাতে কোনোভাবেই পার পেয়ে যেতে না পারে, সে জন্য গোয়েন্দা নজরদারি ও পুলিশি টহল বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
কেবল অপরাধীদের গ্রেপ্তার করাই নয়, বরং অপরাধের মূল উৎস এবং অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার রোধে পুলিশ এই সময়ে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। গত ১ মে থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানে পুলিশ সারা দেশ থেকে মোট ৩২৫টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে। একই সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছে ২ হাজার ৮০২ রাউন্ড তাজা গুলি ও বিভিন্ন ধরনের কার্তুজ, ১০৩টি ম্যাগাজিন, ৪৬টি বিস্ফোরক ককটেল এবং প্রায় ২ দশমিক ২৫ কেজি মারাত্মক গানপাউডার। এর বাইরেও দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ৬৩৮টি ধারালো অস্ত্র, ১৮টি অস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, ১৭টি অস্ত্র ও বোমা তৈরির বিপজ্জনক সরঞ্জাম এবং ১০ হাজার ৩০০টি চকলেট বোমা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। এসব মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধারের মাধ্যমে বড় ধরনের কোনো নাশকতা বা সহিংস অপরাধের পরিকল্পনা ভেস্তে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক এএইচএম শাহাদাত হোসাইন গণমাধ্যমকে দেওয়া এক তথ্যে উদ্ধার হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রগুলোর সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া মোট আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ১০১টি পিস্তল, ৩৫টি শুটারগান, ৩৮টি এলজি, ১৯টি রিভলভার, ৯২টি বন্দুক, ১৫টি পাইপগান, ৭টি শটগান, ৩টি রাইফেল, ২টি এসএমজি, ১২টি এয়ারগান এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি পেনগান। সমাজে এসব প্রাণঘাতী অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ার নেপথ্যে কারা জড়িত এবং এর পেছনে কোনো আন্তর্জাতিক বা দেশীয় চক্র কাজ করছে কি না, তা উদ্ঘাটনে পুলিশ গভীরভাবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। অবৈধ অস্ত্রের এই বিশাল ভান্ডার উদ্ধারের ফলে অপরাধজগতের ডন ও সন্ত্রাসীদের শক্তি অনেকটাই ভেঙে পড়েছে।
অন্যদিকে, যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং মাদকের ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে মুক্ত করতে পুলিশ মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে। এই নির্দিষ্ট তিন মাসের অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য জব্দ করেছে, যার বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা। উদ্ধারকৃত মাদকের মধ্যে রয়েছে অবিশ্বাস্য রকমের ৯১ লাখ ২২ হাজার ৯৯৬ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ৯ হাজার ৮০টি পুরিয়া হেরোইন, ৪ হাজার ৯৫ বোতল ফেনসিডিল, ৮ হাজার ২১১ বোতল বিদেশি মদ, ৪২৩ বোতল দেশি মদ এবং ৮ হাজার ৫৫২ পুরিয়া গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মরণনেশা মাদকদ্রব্য। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের এই কঠোর ও আপসহীন অবস্থানের ফলে মাদক ব্যবসায়ীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।
মাদক উদ্ধারের এই বিশাল চালানের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় মোট ১৭ হাজার ৬৬টি নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে। এসব মাদক মামলা ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের অভিযোগে সারা দেশ থেকে ২৪ হাজার ৮২১ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ, যা মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের শূন্য সহনশীলতা নীতিরই বহিঃপ্রকাশ। সাধারণ মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিতকারী কোনো অপরাধীকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে আরও জানা গেছে, দেশবাসীর সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসন সুদৃঢ় করার স্বার্থে এই বিশেষ ও নিয়মিত অভিযান আগামী দিনেও আরও জোরালোভাবে অব্যাহত থাকবে। সমাজের প্রতিটি স্তরে শান্তি ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ পুলিশের এই মহৎ উদ্যোগ সর্বসাধারণের মাঝে আশার সঞ্চার করেছে।


