প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের উত্তাপ বাড়ছে পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলকে ঘিরে। আগামী ৭ মে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনে মেয়র পদে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সিলেট অঞ্চলের একাধিক পরিচিত মুখ, যা প্রবাসী বাংলাদেশি রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক প্রভাবের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই বরোতে এবারের নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও উত্তেজনা।
এ নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন বর্তমান মেয়র ও অ্যাসপায়ার পার্টির প্রার্থী লুৎফুর রহমান, লেবার পার্টির কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম, টাওয়ার হ্যামলেটস ইনডিপেনডেন্টসের প্রার্থী জামি আলী এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাটস পার্টির মোহাম্মদ আবদুল হান্নান। এদের মধ্যে সিলেট অঞ্চলের তিনজন প্রার্থী থাকা বিষয়টি স্থানীয় কমিউনিটির মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে।
এ ছাড়া নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন কনজারভেটিভ পার্টির ডমিনিক নোলান, গ্রিন পার্টির হীরা খান, ট্রেড ইউনিয়নিস্ট অ্যান্ড সোশ্যালিস্ট কোয়ালিশনের হুগো পিয়েরে, রিফর্ম ইউকের জন বোলার্ড এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ট্যারেন্স ম্যাকগ্রেনেরা। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বর্তমান মেয়র লুৎফুর রহমান এবং লেবার পার্টির সিরাজুল ইসলাম-এর মধ্যে।
টাওয়ার হ্যামলেটস দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে বহু বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিক বসবাস করেন এবং স্থানীয় রাজনীতিতে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। এই বরোর দুটি পার্লামেন্ট আসনে বর্তমানে দুইজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি দায়িত্ব পালন করছেন—রুশনারা আলী এবং আপসানা বেগম। ফলে এই অঞ্চলের নির্বাচন সবসময়ই আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
বর্তমান মেয়র লুৎফুর রহমান দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় এসেছেন। শৈশবে সিলেট থেকে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমানো এই নেতা পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একটি পরিচিত মুখ। আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি সলিসিটর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং পরে স্থানীয় রাজনীতিতে যুক্ত হন।
তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় লেবার পার্টির মাধ্যমে। পরে নানা রাজনৈতিক ওঠানামার মধ্য দিয়ে তিনি নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেন এবং ২০১০ সালে প্রথমবার সরাসরি মেয়র নির্বাচিত হন। এরপর নানা বিতর্ক ও আদালতের রায়-নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে তিনি আবারও রাজনীতিতে ফিরে আসেন এবং বর্তমানে অ্যাসপায়ার পার্টির নেতৃত্বে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তার সমর্থকরা মনে করেন, অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিক নেতৃত্ব তাকে আবারও বিজয়ের পথে নিয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে লেবার পার্টির প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয়। ২০০১ সাল থেকে তিনি টানা সাতবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে এলাকায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা এই নেতা কর্মজীবনের শুরুতে শ্রমজীবী হিসেবে কাজ করলেও পরে রাজনীতিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার সমর্থকদের মতে, অভিজ্ঞতা ও জনসম্পৃক্ততার কারণে তিনি একজন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
সিরাজুল ইসলাম নির্বাচিত হলে আবাসন সংকট নিরসনে পাঁচ হাজার নতুন ঘর নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, টাওয়ার হ্যামলেটসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাসস্থান সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি।
অন্যদিকে জামি আলী, যিনি টাওয়ার হ্যামলেটস ইনডিপেনডেন্টস থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, আইন পেশায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্বাচনে নেমেছেন। তিনি মনে করেন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং কাউন্সিলের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা দূর করা জরুরি। নির্বাচিত হলে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে স্বাধীন অডিট এবং জনসেবায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটস প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুল হান্নান একজন ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা। তিনি টেলিকম খাতে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। তার মতে, টাওয়ার হ্যামলেটসকে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন এবং সুশৃঙ্খল শহর হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। তিনি আবাসন, সড়ক নিরাপত্তা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এবারের নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশি কমিউনিটির ভোটারদের ভূমিকা নির্ধারণ করবে শেষ পর্যন্ত কে মেয়রের চেয়ারে বসবেন। একই সঙ্গে এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক সক্ষমতা এবং প্রভাবের একটি বড় পরীক্ষাও বটে।
কমিউনিটি নেতারা বলছেন, টাওয়ার হ্যামলেটসের মতো বৈচিত্র্যময় এলাকায় নেতৃত্ব দেওয়া অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এখানে অর্থনীতি, হাউজিং, শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং সামাজিক বৈষম্য—সবকিছুই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ভোটাররা এবার প্রার্থী নির্বাচনে অভিজ্ঞতা, স্বচ্ছতা এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনাকে বেশি গুরুত্ব দেবেন।
সব মিলিয়ে টাওয়ার হ্যামলেটসের আসন্ন নির্বাচন শুধু একটি স্থানীয় রাজনৈতিক ইভেন্ট নয়, বরং এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক প্রভাব, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, ৭ মে’র ভোটে কে জয়ী হয়ে এই বহুসাংস্কৃতিক বরোর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।


