প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল এবং ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। একই সময়ে বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের মোট ১৪ নেতাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।
বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে এসব সিদ্ধান্ত জানানো হয়। তবে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্তির বিজ্ঞপ্তিতে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাকে সরাসরি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। বিএনপির পক্ষ থেকে কমিটি বিলুপ্তির নির্দিষ্ট কারণ বিস্তারিতভাবে জানানো হয়নি। অন্যদিকে যুবদল ও ছাত্রদলের বিজ্ঞপ্তিতে সংশ্লিষ্ট কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক মুহম্মদ মুনির হোসেন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মো. আমিনুল হককে আহ্বায়ক এবং মো. মোস্তফা জামানকে সদস্য সচিব করে গঠিত ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। একই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, শিগগিরই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর এই কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনাটি সামনে আসার পরপরই সংগঠনটির মহানগর পর্যায়ের কাঠামোতে এই পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম আলোচনায় এসেছে। তবে কমিটি বিলুপ্তির সঙ্গে ওই ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন কোনো বক্তব্য সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া হয়নি। ফলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং তদন্তাধীন ঘটনার দায়কে পৃথকভাবে দেখা প্রয়োজন।
বিএনপি একই সময়ে তিন নেতাকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তও জানিয়েছে। শাহআলী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খলিল চৌধুরী, ‘সি’ ব্লক ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য হাফিজুর রহমান শুক্কুকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলীয় সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে তাদের বিরুদ্ধে অনৈতিক কার্যকলাপ ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের কমিটিও বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। যুবদলের দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় সেটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়ন এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছেন।
ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও একই রাতে বিলুপ্ত করা হয়। সংগঠনটির বিজ্ঞপ্তিতে কমিটির মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কথা জানিয়ে শিগগির নতুন কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই কমিটির আওতায় বৃহত্তর মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকার একাধিক থানা ছিল বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।
ছাত্রদলের পক্ষ থেকে পৃথকভাবে পাঁচ নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সহসভাপতি সারোয়ার আলম পিয়াস, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম জিন্নাহ, দারুসসালাম থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইকবাল হোসেন দিপু, সদস্য সচিব ওমর নাইম এবং ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সদস্য সচিব শান্ত রহমানকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনায় মিরপুর এলাকায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় রাজনীতি নতুন করে আলোচনায় আসে। সম্প্রতি রাজধানীর শাহআলী এলাকায় অবস্থিত ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটির পর হামলায় কারা অংশ নিয়েছিল, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় কী এবং এর পেছনে কোনো সাংগঠনিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থ ছিল কি না—এসব বিষয় নিয়ে তদন্ত ও রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়।
এদিকে স্বেচ্ছাসেবক দলও দারুসসালাম থানা শাখার দুই নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। সংগঠনটির আহ্বায়ক মো. আক্তার হোসেন মামুন এবং সদস্য সচিব মো. হাফিজুর রহমানকে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাপরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠনের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের সাংগঠনিক যোগাযোগ না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় সভাপতি এস এম জিলানী ও সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
শ্রমিক দলও একই ধারাবাহিকতায় চার নেতাকে সংগঠনের সব পদ থেকে বহিষ্কার করেছে। শাহআলী থানা শ্রমিক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনির হোসেন, শাহআলী থানা অটোরিকশা শ্রমিক দলের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন, সদস্য হুজাইফা এবং দারুসসালাম থানা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক গোলাম রসুল পারভেজের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাপরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আনোয়ার হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম খান নাসিম এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছেন।
সব মিলিয়ে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের পক্ষ থেকে তিনটি কমিটি বিলুপ্ত এবং ১৪ নেতাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের বড় একটি অংশের ক্ষেত্রে দলীয় শৃঙ্খলা, অনৈতিক কর্মকাণ্ড কিংবা কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনা এবং মিরপুর এলাকায় সংগঠনের স্থানীয় পর্যায়ের নানা অভিযোগের প্রেক্ষাপটও একই সময়ে সামনে এসেছে।
এর আগে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির পল্লবী থানার অধীন ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মফিজুর রহমান মামুনকেও দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। বিএনপির পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে অনৈতিক কার্যকলাপ ও দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগের কথা জানানো হয়েছে।
মামুনের বিরুদ্ধে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় একটি অপরাধী চক্র পরিচালনার অভিযোগও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তার ভাই জামিল রহমান ও মশিউর রহমানের মাধ্যমে ওই চক্র পরিচালিত হতো বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পল্লবী, মিরপুর-১২, সাগুফতা ও বাউনিয়া এলাকায় চাঁদাবাজি, গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, জমি দখল ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে ওই চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটি আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগ ও প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।
রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক এলাকায় একসঙ্গে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বহিষ্কারের ঘটনা স্থানীয় রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে নতুন কমিটিগুলোতে কারা দায়িত্ব পাবেন, সাংগঠনিক কাঠামো কীভাবে পুনর্গঠন করা হবে এবং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত ঘোষণা আসেনি।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের হামলা ও ভাঙচুরের মতো ঘটনা রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য শুধু সাংগঠনিক শৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকারের সঙ্গেও সম্পর্কিত। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম ব্যাহত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই এলাকার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যাদের কাছে সরকারি বা স্বল্পব্যয়ের স্বাস্থ্যসেবা গুরুত্বপূর্ণ। তাই ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, কেন হামলা হয়েছিল এবং কারা এর পেছনে ছিলেন—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উত্তর খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার তদন্তও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো নেতা বা কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াই ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণের পথ। একই সঙ্গে দলীয় শৃঙ্খলাবিষয়ক সিদ্ধান্তগুলোও রাজনৈতিক সংগঠনের নিজস্ব প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।
ঢাকার মিরপুর ও আশপাশের এলাকায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামোয় এই পরিবর্তনের পর নতুন নেতৃত্ব কীভাবে দায়িত্ব পালন করে এবং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কী ধরনের সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যেন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, সম্পদ ও প্রয়োজনীয় সেবাকে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না করে—তা নিশ্চিত করা।


